সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার পরবর্তী বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:৫৬:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / ৪৩২ Time View

MODI AND HASIAN 2

দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা (২০২২) – ছবি – বিবিসি

 

বিবিসির প্রতিবেদন

শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং প্রধানমন্ত্রী দেশ ত্যাগ করার মাত্র ১৫ দিন আগে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছিল। এর পরের দিন দিল্লির প্রধান সংবাদপত্র ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল ‘ডিসটার্বিং ইন ঢাকা’। সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “কোটা বিরোধী আন্দোলনের সহিংসতা আসলে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রতিফলন। ভারতকে এখন শেখ হাসিনার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হবে (ইন্ডিয়া মাস্ট থিংক বিয়ন্ড হাসিনা)।”

বিগত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা এবং ভারতের বাংলাদেশ নীতি একপ্রকার সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ভারতকে এখন নতুন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হচ্ছে, যেখানে শেখ হাসিনার বিকল্প নিয়ে চিন্তা করাই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। দুই সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা থেকে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ভারতের জন্যও বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন শেখ হাসিনার পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্র্যাটেজি তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

যদিও শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকবেন না, ভারতের হয়তো আশা ছিল যে, সেই সময় আসতে এখনো অনেক বাকি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছিল যে, “বাংলাদেশ আজ গণতন্ত্রের মৌলিক চেকবক্স পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার মধ্যে আছে কার্যকর বিরোধীদল, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, এবং স্বাধীন বিচারবিভাগ।”

এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনরোষ ভারতের জন্যও একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। ভারত চায় না যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলে সেখানে পাকিস্তান-সমর্থিত কোনো সরকার আসুক। ফলে ভারতের জন্য এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের সমাজের প্রতিটি স্তরের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার, তাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য।

ভারতের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই স্বীকার করছেন, ওই সম্পাদকীয়তে যা বলা হয়েছিল, তা আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এখন ভারত দ্রুত নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে, সেই সরকারের নেতৃবৃন্দের সাথে কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপন করছে। একইসাথে রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে মনে হলেও ভারত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের উপায় নিয়ে ভাবছে।

এছাড়া, জামায়াত বা হেফাজতে ইসলামের মতো ইসলামী সংগঠনগুলোর উত্থানও ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, যা বর্তমান সংকটের সময়ে রক্ষা করা ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রকল্প থমকে আছে এবং শেখ হাসিনা এখন ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন। এর ফলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দোটানায় আছে—তারা তাকে মেনে নিতে পারছে না, আবার তাকে ত্যাগও করতে পারছে না।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে এক মাস আগের ঘটনাপ্রবাহ ভারতের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত সংকট তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক নানা বিষয়ে প্রভাব ফেলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে ভারতের পরিচয়

গত ৮ আগস্ট, মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স-এ (পূর্বে টুইটার) তাকে শুভেচ্ছা জানান। মোদি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মানুষের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে ভারত সদা প্রস্তুত এবং একসাথে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

কিছুদিন পর, মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন এবং ভার্চুয়াল ভাষণ দেন। এরপর তাদের মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনও হয়। এর ফলে, মুহাম্মদ ইউনূসকে বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধান হিসেবে ভারত কোনো দ্বিধা ছাড়াই মেনে নিয়েছে। শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের অতীত, তা ভারত একাধিকবার স্পষ্ট করেছে।

ভার্মার সাক্ষাৎ

৬ আগস্ট, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সংসদে উল্লেখ করেন যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে এসেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শেখ হাসিনাকে একাধিকবার ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ঢাকার পরিস্থিতি যতই বিতর্কিত হোক না কেন, ভারত বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কাজ শুরু করেছে।

একটি বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে। তবে দিল্লি সবসময় যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। রাজনৈতিক পরিবর্তন স্বাভাবিক এবং কখনও কখনও তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই ভারতের স্বার্থ যেসব ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সঙ্গে মিলবে, সেগুলো চিহ্নিত করার ওপর এখন দিল্লির জোর।

দিল্লির সাউথ ব্লকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, নতুন সরকারের উপদেষ্টা বা নীতিনির্ধারকদের সম্পর্কে ভারত এখনো পূর্ণ জ্ঞান রাখে না এবং তাদের সরকারে আসার প্রক্রিয়াও স্পষ্ট নয়। মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কেও পূর্ণ ধারণা না থাকায়, ভারত প্রথম পর্যায়ে তাদের ভালোভাবে বুঝতে ও পরিচিত হতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা যখন ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেটিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘পরিচিতিমূলক’ সাক্ষাৎ বলে উল্লেখ করেছে। সবমিলিয়ে, গত এক মাস ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সরকারের মধ্যে সম্পর্ক গড়ার এক ধাপ ছিল, যা আরও কিছুদিন চলবে বলে ধারণা করা যায়।

বিএনপির সাথে যোগাযোগ?

বাংলাদেশে গত দেড় দশক ধরে ভারতের বিরুদ্ধে একটি প্রধান অভিযোগ ছিল যে, তারা শুধু শাসক দল আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বিষয়গুলোকে ‘আওয়ামী লীগ প্রিজম’ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে। দিল্লি এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, বরং তারা বলেছে যে যেসব দল ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি করে এবং ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারেনি, তাদের সাথে সম্পর্ক গড়া কঠিন।

এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) সম্পর্কে ভারতের একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। যতদিন বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করবে, ততদিন ভারতের সাথে বিএনপির কোনো সম্পর্ক গড়া সম্ভব হবে না। ভারতের কাছে জামায়াতের মতাদর্শ এতটাই অগ্রহণযোগ্য যে তাদের রাজনৈতিক সঙ্গীকেও বিশ্বাস করা কঠিন।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে কিছু ইস্যুতে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, যা ভারতের নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এটি ভারতের জন্য বিএনপির সাথে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপির সাথে ভারতীয় সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ ছিল না; কিছু যোগাযোগ চ্যানেল সবসময় খোলা ছিল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ, যিনি দীর্ঘ এক দশক ভারতে ছিলেন, তার সাথে ভারতীয় সম্পর্ক ছিল। তিনি ভারতে অবস্থানের সময় ভারতের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন এবং সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। ভারতের পর্যবেক্ষকদের মতে, সালাউদ্দিন আহমেদ ভবিষ্যতে বিএনপি-ভারত সম্পর্ক গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন

তবে, বিএনপির সাথে সম্পর্ক তৈরি হলে ভারত আওয়ামী লীগের প্রতি কেমন আচরণ করবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত চাইবে যে আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি ভারতের অর্থনৈতিক পত্রিকা ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’ জানায়, ভারতের পাঁচটি বিদ্যুৎ কোম্পানির বাংলাদেশের কাছে মোট ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি পাওনা রয়েছে। বিশেষত আদানি পাওয়ারের ৮০ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এই বকেয়া অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে গত মাস থেকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ রয়েছে এবং কর্মীরাও ফিরে এসেছেন। এতে রামপালের মৈত্রী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও নুমালিগড়-পার্বতীপুর পাইপলাইনের মতো প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে আশাবাদী যে এই প্রকল্পগুলোর জন্য এখনও অনেক পথ খোলা রয়েছে, কারণ এর মধ্যে ‘সার্বভৌম নিশ্চয়তা’ রয়েছে এবং প্রকল্প বাতিল হলে ক্ষতিপূরণের দাবি করা যাবে।

শেখ হাসিনা ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশল

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের রাজধানীতে অবস্থান করছেন। ভারত শেখ হাসিনার পাশে থেকে তাকে সমর্থন জানিয়েছে, তবে তাদের বুঝতে হবে এই সম্পর্ক বাংলাদেশে নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

সাবেক কূটনীতিক ড. মোহন কুমার মনে করেন, শেখ হাসিনার পরিণতি থেকে ভারতকে শিক্ষা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিনিয়োগ করতে হবে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নয়। বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারতে এই কৌশল পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে তার অভিমত।

সূত্র : বিবিসি

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শেখ হাসিনার পরবর্তী বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি

Update Time : ০৫:৫৬:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪
দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা (২০২২) – ছবি – বিবিসি

 

বিবিসির প্রতিবেদন

শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং প্রধানমন্ত্রী দেশ ত্যাগ করার মাত্র ১৫ দিন আগে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছিল। এর পরের দিন দিল্লির প্রধান সংবাদপত্র ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল ‘ডিসটার্বিং ইন ঢাকা’। সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “কোটা বিরোধী আন্দোলনের সহিংসতা আসলে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রতিফলন। ভারতকে এখন শেখ হাসিনার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হবে (ইন্ডিয়া মাস্ট থিংক বিয়ন্ড হাসিনা)।”

বিগত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা এবং ভারতের বাংলাদেশ নীতি একপ্রকার সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ভারতকে এখন নতুন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হচ্ছে, যেখানে শেখ হাসিনার বিকল্প নিয়ে চিন্তা করাই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। দুই সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা থেকে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ভারতের জন্যও বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন শেখ হাসিনার পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্র্যাটেজি তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

যদিও শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকবেন না, ভারতের হয়তো আশা ছিল যে, সেই সময় আসতে এখনো অনেক বাকি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছিল যে, “বাংলাদেশ আজ গণতন্ত্রের মৌলিক চেকবক্স পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার মধ্যে আছে কার্যকর বিরোধীদল, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, এবং স্বাধীন বিচারবিভাগ।”

এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনরোষ ভারতের জন্যও একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। ভারত চায় না যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলে সেখানে পাকিস্তান-সমর্থিত কোনো সরকার আসুক। ফলে ভারতের জন্য এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের সমাজের প্রতিটি স্তরের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার, তাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য।

ভারতের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই স্বীকার করছেন, ওই সম্পাদকীয়তে যা বলা হয়েছিল, তা আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এখন ভারত দ্রুত নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে, সেই সরকারের নেতৃবৃন্দের সাথে কৌশলগত যোগাযোগ স্থাপন করছে। একইসাথে রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে মনে হলেও ভারত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের উপায় নিয়ে ভাবছে।

এছাড়া, জামায়াত বা হেফাজতে ইসলামের মতো ইসলামী সংগঠনগুলোর উত্থানও ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, যা বর্তমান সংকটের সময়ে রক্ষা করা ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রকল্প থমকে আছে এবং শেখ হাসিনা এখন ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন। এর ফলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দোটানায় আছে—তারা তাকে মেনে নিতে পারছে না, আবার তাকে ত্যাগও করতে পারছে না।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে এক মাস আগের ঘটনাপ্রবাহ ভারতের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত সংকট তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক নানা বিষয়ে প্রভাব ফেলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে ভারতের পরিচয়

গত ৮ আগস্ট, মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স-এ (পূর্বে টুইটার) তাকে শুভেচ্ছা জানান। মোদি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মানুষের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে ভারত সদা প্রস্তুত এবং একসাথে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

কিছুদিন পর, মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন এবং ভার্চুয়াল ভাষণ দেন। এরপর তাদের মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনও হয়। এর ফলে, মুহাম্মদ ইউনূসকে বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধান হিসেবে ভারত কোনো দ্বিধা ছাড়াই মেনে নিয়েছে। শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের অতীত, তা ভারত একাধিকবার স্পষ্ট করেছে।

ভার্মার সাক্ষাৎ

৬ আগস্ট, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সংসদে উল্লেখ করেন যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে এসেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শেখ হাসিনাকে একাধিকবার ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ঢাকার পরিস্থিতি যতই বিতর্কিত হোক না কেন, ভারত বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কাজ শুরু করেছে।

একটি বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে। তবে দিল্লি সবসময় যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। রাজনৈতিক পরিবর্তন স্বাভাবিক এবং কখনও কখনও তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই ভারতের স্বার্থ যেসব ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সঙ্গে মিলবে, সেগুলো চিহ্নিত করার ওপর এখন দিল্লির জোর।

দিল্লির সাউথ ব্লকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, নতুন সরকারের উপদেষ্টা বা নীতিনির্ধারকদের সম্পর্কে ভারত এখনো পূর্ণ জ্ঞান রাখে না এবং তাদের সরকারে আসার প্রক্রিয়াও স্পষ্ট নয়। মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কেও পূর্ণ ধারণা না থাকায়, ভারত প্রথম পর্যায়ে তাদের ভালোভাবে বুঝতে ও পরিচিত হতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা যখন ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেটিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘পরিচিতিমূলক’ সাক্ষাৎ বলে উল্লেখ করেছে। সবমিলিয়ে, গত এক মাস ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সরকারের মধ্যে সম্পর্ক গড়ার এক ধাপ ছিল, যা আরও কিছুদিন চলবে বলে ধারণা করা যায়।

বিএনপির সাথে যোগাযোগ?

বাংলাদেশে গত দেড় দশক ধরে ভারতের বিরুদ্ধে একটি প্রধান অভিযোগ ছিল যে, তারা শুধু শাসক দল আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বিষয়গুলোকে ‘আওয়ামী লীগ প্রিজম’ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে। দিল্লি এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, বরং তারা বলেছে যে যেসব দল ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি করে এবং ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারেনি, তাদের সাথে সম্পর্ক গড়া কঠিন।

এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) সম্পর্কে ভারতের একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। যতদিন বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করবে, ততদিন ভারতের সাথে বিএনপির কোনো সম্পর্ক গড়া সম্ভব হবে না। ভারতের কাছে জামায়াতের মতাদর্শ এতটাই অগ্রহণযোগ্য যে তাদের রাজনৈতিক সঙ্গীকেও বিশ্বাস করা কঠিন।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে কিছু ইস্যুতে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, যা ভারতের নীতিনির্ধারকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এটি ভারতের জন্য বিএনপির সাথে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপির সাথে ভারতীয় সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ ছিল না; কিছু যোগাযোগ চ্যানেল সবসময় খোলা ছিল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ, যিনি দীর্ঘ এক দশক ভারতে ছিলেন, তার সাথে ভারতীয় সম্পর্ক ছিল। তিনি ভারতে অবস্থানের সময় ভারতের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন এবং সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। ভারতের পর্যবেক্ষকদের মতে, সালাউদ্দিন আহমেদ ভবিষ্যতে বিএনপি-ভারত সম্পর্ক গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন

তবে, বিএনপির সাথে সম্পর্ক তৈরি হলে ভারত আওয়ামী লীগের প্রতি কেমন আচরণ করবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত চাইবে যে আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি ভারতের অর্থনৈতিক পত্রিকা ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’ জানায়, ভারতের পাঁচটি বিদ্যুৎ কোম্পানির বাংলাদেশের কাছে মোট ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি পাওনা রয়েছে। বিশেষত আদানি পাওয়ারের ৮০ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এই বকেয়া অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে গত মাস থেকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ রয়েছে এবং কর্মীরাও ফিরে এসেছেন। এতে রামপালের মৈত্রী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও নুমালিগড়-পার্বতীপুর পাইপলাইনের মতো প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে আশাবাদী যে এই প্রকল্পগুলোর জন্য এখনও অনেক পথ খোলা রয়েছে, কারণ এর মধ্যে ‘সার্বভৌম নিশ্চয়তা’ রয়েছে এবং প্রকল্প বাতিল হলে ক্ষতিপূরণের দাবি করা যাবে।

শেখ হাসিনা ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশল

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের রাজধানীতে অবস্থান করছেন। ভারত শেখ হাসিনার পাশে থেকে তাকে সমর্থন জানিয়েছে, তবে তাদের বুঝতে হবে এই সম্পর্ক বাংলাদেশে নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

সাবেক কূটনীতিক ড. মোহন কুমার মনে করেন, শেখ হাসিনার পরিণতি থেকে ভারতকে শিক্ষা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিনিয়োগ করতে হবে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নয়। বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারতে এই কৌশল পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে তার অভিমত।

সূত্র : বিবিসি