একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের বড় সুখবর
- Update Time : ০৯:৩১:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
- / ৫৭ Time View

একীভূত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। এখন থেকে শুধু নিজের চিকিৎসার জন্য নয়, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত উত্তোলনের সুযোগ পাবেন গ্রাহকেরা।
বুধবার (২৯ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
শুধু নিজের চিকিৎসা নয়, পরিবারের জরুরি প্রয়োজনেও টাকা তোলা যাবে
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বিশেষ স্কিমের আওতায় আমানতকারীরা নিজেদের চিকিৎসার প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ পেতেন। নতুন সংশোধিত ব্যবস্থায় সেই সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
এখন আমানতকারীরা নিজেদের পাশাপাশি বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন এবং স্বামী বা স্ত্রীর চিকিৎসার প্রয়োজনেও অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
এর পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন আমানতকারীর জীবনে চিকিৎসার বাইরেও নানা ধরনের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। পরিবারের কোনো সদস্যের আকস্মিক চিকিৎসা, মেয়ের বিয়ে কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক প্রয়োজনেও অর্থের দরকার হতে পারে। আগের নীতিমালায় এসব ক্ষেত্রে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ সীমিত ছিল। সংশোধিত স্কিমে সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
আমানত ফেরত দেওয়ার বিশেষ স্কিমে সংশোধন
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য তৈরি করা বিশেষ স্কিমে সংশোধন এনে তা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। পর্ষদ সভায় সংশোধিত স্কিমের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ উত্তোলন নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা আমানতকারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কীভাবে সংকটে পড়ল পাঁচ ব্যাংক?
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্য চারটি ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাদের নিয়ন্ত্রণকালে জামানত ছাড়াই অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে ব্যাংকগুলো ব্যাপক আর্থিক সংকটে পড়ে এবং একপর্যায়ে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।
গঠন করা হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’
ব্যাংকগুলোর সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে।
নবগঠিত ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে সাধারণ আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আমানত বীমা তহবিল থেকে অর্থ দিয়ে গ্রাহকদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। অবশিষ্ট আমানত পর্যায়ক্রমে ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ স্কিম বাস্তবায়ন করছে।
৮ লাখের বেশি আমানতকারী পেয়েছেন অর্থ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমানত বীমা তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ৮ লাখ ২২ হাজার আমানতকারীকে ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
তবে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংকগুলোর বিপুল খেলাপি ঋণ আদায় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
গত ডিসেম্বর শেষে পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের মাত্র ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৮৭ দশমিক ৪৩ শতাংশই খেলাপি।
এ অবস্থায় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া, খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন—সবগুলোই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় পরীক্ষা।
আমানতকারীদের জন্য নতুন সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে?
দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের জমানো অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা গ্রাহকদের জন্য জরুরি প্রয়োজনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর।
তবে আমানতকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে শুধু সীমিত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ যথেষ্ট নয়। তাদের বৈধ আমানত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়ায় ফেরত দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সঙ্গে বিপুল খেলাপি ঋণের অর্থ উদ্ধার, ব্যাংকের সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং অতীতে সংঘটিত অনিয়মের দায় নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
আমানতকারীদের টাকা তাদের অধিকার—এটি কোনো অনুগ্রহ নয়। তাই একীভূত ব্যাংকের পুনর্গঠনের পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।














