জ্বালানিসংকটের অজুহাতে শিক্ষায় আরেকটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত?
- Update Time : ১১:২৫:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
- / ২২১ Time View

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যেন বারবার পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘ ছুটি, আন্দোলন ও মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে যখন শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই আবার নতুন করে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এবার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই বাস্তবসম্মত, নাকি এটি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আরেকটি চাপিয়ে দেওয়া আত্মঘাতী নীতি?
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সপ্তাহে তিন দিন সশরীরে এবং তিন দিন অনলাইনে ক্লাস চালুর একটি ‘অল্টারনেটিভ ডে’ মডেল বিবেচনায় রয়েছে। প্রথম দেখায় এটি ভারসাম্যপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশে এখনো কি এমন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী সমানভাবে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট—না।
গ্রামাঞ্চল তো দূরের কথা, অনেক শহরেও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এখনো একটি বিলাসিতা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার নেই। একটি পরিবারের একাধিক শিক্ষার্থী থাকলে ডিভাইস সংকট আরও প্রকট হয়। তাহলে সরকার কি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করেছে? যদি না করে থাকে, তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যত হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে দেওয়ার সামিল।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কেন জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যবস্তু হবে? দেশের বাজার, শপিংমল, বিয়ে বাড়ি, কমিউনিটি সেন্টার—সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে, আলোকসজ্জায় ভরপুর। সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, অথচ স্কুল-কলেজ বন্ধ বা আংশিক অনলাইনে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। তাহলে কি শিক্ষাই সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ খাত?
বাস্তবতা হলো, শিক্ষা কোনো পরীক্ষামূলক খাত নয়। এখানে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে একটি প্রজন্মের ওপর। ইতোমধ্যে মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার সীমাবদ্ধতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—সবকিছুই ছিল স্পষ্ট। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে আবার একই পথে হাঁটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
জ্বালানি সাশ্রয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার জন্য কি বিকল্প কোনো পথ নেই? সপ্তাহে ছয় দিনের সশরীর ক্লাস চালু রেখে সময়সূচি কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে। ক্লাসের সময়সীমা পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। এমনকি অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর জন্য অন্যান্য খাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—যেমন অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ, বাণিজ্যিক স্থাপনায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।
শিক্ষা খাতকে বারবার পরীক্ষার ময়দান বানানো বন্ধ করতে হবে। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের ওপর। সেই ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
আজ সময় এসেছে বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করতে হবে—কিন্তু তার মূল্য যেন শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে না দিতে হয়। অন্যথায়, আমরা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আরও একটি হারানো প্রজন্মের সাক্ষী হবো।




















