সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে
- Update Time : ০৬:৪৪:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ২৪২ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, তারল্য সংকট এবং ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে গভীর আর্থিক অস্থিরতার মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ এবং নতুনভাবে একীভূত ব্যাংক চালুর লক্ষ্যে খরচ কমানো এখন সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হচ্ছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’
যেসব পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট, সেগুলো হলো—
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।
ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে আমানত তুলে নেওয়ার চাপ, বিনিয়োগ ফেরত না আসা, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ ও সুদের পরিবর্তে মুনাফা-বিতরণ কাঠামোর ভারসাম্যহীনতার কারণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে তাদের একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক—‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠকে বেতন-ভাতা কমানোর কঠোর পরামর্শ
গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সদর দপ্তরে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যাংকগুলো এক হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চাইলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে মাত্র ৩৫০ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান—
- ব্যাংকগুলোর অব্যাহত লোকসান,
- গ্রাহকেরা টাকা তুলতে না পারা,
- বেতন দিতে হিমশিম খাওয়া,
- দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা
এসব বিবেচনায় খরচ কমানো ছাড়া অন্য কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই। তাই কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
১৬ হাজার কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বর্তমান পাঁচ ব্যাংকে মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এই বিপুলসংখ্যক কর্মীর জীবনযাত্রা এবং আর্থিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন—
- ভবিষ্যতে কর্মী ছাঁটাইও হতে পারে,
- পদোন্নতি ও সুবিধা বন্ধ থাকতে পারে,
- একীভূত হওয়ার পরে নতুন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু হতে পারে।
৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার সরকারি সহায়তা এখনো ফেরত দেয়নি ব্যাংকগুলো
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—গত কয়েক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে এসব ব্যাংককে প্রায় ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অথচ এর বেশির ভাগ অর্থ এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই দায় এবং অব্যবস্থাপনা ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আমানতকারীদের জন্য সীমিত উত্তোলন—দুই লাখ টাকা পর্যন্ত
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একীভূত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালুর পর সাধারণ আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এতে বড় অঙ্কের আমানতকারীরা আপাতত তাদের অর্থ আটকে থাকার ঝুঁকিতে পড়বেন।
নতুন ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করবে সাত সদস্যের একটি নতুন বোর্ড।
- সভাপতি হবেন—আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক।
- অন্যান্য সদস্য—সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও যুগ্ম সচিবরা।
- পাশাপাশি সমানসংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে পেশাদার ব্যাংকার, সিএ, আইনজীবী ও ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞদের।
এমডি ও অন্যান্য শীর্ষপদে নিয়োগ হবে সার্চ কমিটির মাধ্যমে—যা ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—
একীভূত ব্যাংক চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম, ঋণখেলাপ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে একটি টেকসই ইসলামী ব্যাংকিং মডেলে ফিরে আসতে সময় লাগবে।
তবে সরকারি তত্ত্বাবধানে নতুন ব্যাংক পরিচালিত হলে সুশাসন কিছুটা নিশ্চিত হতে পারে বলে অনেকে আশা করছেন।










