নিউইয়র্কে ডা. শফিকুর রহমান ,‘শুধু ’৭১ নয়, ’৪৭ থেকে আজ পর্যন্ত সব ভুলের জন্য ক্ষমা চাই’
- Update Time : ০৮:৪১:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৫১ Time View

নিউইয়র্কে ডা. শফিকুর রহমান
‘শুধু ’৭১ নয়, ’৪৭ থেকে আজ পর্যন্ত সব ভুলের জন্য ক্ষমা চাই’
নিউইয়র্কে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দলটি কেবল ১৯৭১ সালের নয়, বরং ১৯৪৭ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যত ভুল করেছে—সব কিছুর জন্য তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চাইছেন। তিনি বলেন, “আমরা মানুষ, তাই ভুল আমাদের হবেই। আমাদের সংগঠনও মানুষের সংগঠন। যদি একশ কাজের মধ্যে একটি ভুল হয়, এবং সেই ভুলে জাতির ক্ষতি হয়—তাহলে ক্ষমা চাওয়াই আমাদের দায়িত্ব।”
বুধবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রথম দিনে নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকার ওয়ার্ল্ড ফেয়ার মেরিনা পার্টি হলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ আয়োজনের উদ্যোগ নেয় কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন (কোবা)। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাষ্ট্র শাখার সমন্বয়কারী ডা. নাকিবুর রহমান।
অতীতের ভুলের স্বীকারোক্তি
গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আজ পর্যন্ত আমরা কোনো ভুল করিনি—এটা আমি কখনো বলিনি, আমার কোনো সহকর্মীও বলেননি। যদি কেউ বলে তারা সব ভুলের ঊর্ধ্বে, জাতি সেটা মানবে না। আমরাও সে দাবি করি না।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের জানা–অজানা যত ভুল হয়েছে, যারা তা ধরিয়ে দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আর যাদের আমরা কষ্ট দিয়েছি, তাদের কাছে বিনা শর্তে ক্ষমা চাই।”
তিনি বলেন, “অনেকে বলছেন, এভাবে ক্ষমা চাওয়া চলবে না। আমি বলি—বিনা শর্তে মাফ চাইলাম, আর কী বাকি রইল? আজ আবারও বলছি—সাতচল্লিশ থেকে শুরু করে আজ ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত, আমাদের দ্বারা যারা কোনোভাবে কষ্ট পেয়েছেন, আমরা সবাই তাদের কাছে ক্ষমা চাই। সেটা ব্যক্তি হোক, সংগঠন হোক, কিংবা পুরো জাতি—সবার কাছেই।”
“বাংলাদেশ হবে বাংলাদেশই”
জামায়াতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কখনো আফগানিস্তান, পাকিস্তান কিংবা ইরান হবে না। আমরা যদি জনগণের রায় নিয়ে সরকার গঠন করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ হবে এক শান্তিপূর্ণ, ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত দেশ—আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টির ধারায়।”
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে যুগের পর যুগ ধরে ভিন্ন ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে। মাঝে মাঝে কিছু কালো দাগ পড়েছে, কিন্তু আমরা সেই বিভাজন দূর করব। আমরা ‘মেজোরিটি-মাইনোরিটি’ ধারণায় বিশ্বাস করি না। আমরা বলি, উই নিড ইউনিটি—আমাদের দরকার ঐক্য।”
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে অবস্থান
ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “মানুষ তার বাসস্থান পাল্টাতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টাতে পারে না। তাই আমরা আমাদের প্রতিবেশীকে শ্রদ্ধা করতে চাই, একইভাবে আমরা আমাদের প্রাপ্য সম্মানও প্রত্যাশা করি।”
তিনি আরও বলেন, “ভারত একটি বিশাল দেশ—জনসংখ্যা ও আয়তনে আমাদের চেয়ে ২৬ গুণ বড়। আমরা তাদের অবস্থান সম্মান করি, তবে তারা যেন আমাদের ছোট্ট দেশ, আমাদের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকেও সম্মান করে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে। এতে দুই দেশই উপকৃত হবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মর্যাদা পাবে।”
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতা
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, “আমরা দুটি পৃথক রাজনৈতিক দল। জাতীয় প্রয়োজনে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছি, কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। তারা তাদের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছে, আমরাও আমাদের কর্মসূচি নিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “গত বছরের আগস্টে আমরা কয়েকটি বন্ধু সংগঠনের সঙ্গে বসেছিলাম। তখন বলেছিলাম, দেশের ১৮ কোটি মানুষই নিপীড়িত। আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন, এবার দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম, কিছু কাজ বন্ধ করলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। কিন্তু তা হয়নি। তাই আমরা নীতিগত অবস্থান থেকে কথা বলি, ব্যক্তিগত আক্রমণ করি না। যদি কেউ মনে করেন আমাদের কথা তাঁর বিরুদ্ধে, তাহলে বোঝা যায়, তিনিই তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো—সমালোচনা মেনে নেওয়া। অন্যের মতামত শুনতে হবে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে হবে। আমরাও সেটা করি, অন্যদের কাছ থেকেও সেটাই প্রত্যাশা করি।”
যুক্তরাষ্ট্র সফর ও গোপন বৈঠক
সপ্তাহব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র সফরের অংশ হিসেবে ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটি সিক্রেট।”
বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, সেটি মোকাবিলায় এখন দলটি নরম কূটনৈতিক ভাষা ও আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে। বিশেষত আন্তর্জাতিক মহলে ইমেজ পুনরুদ্ধার ও দেশে রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে আসার লক্ষ্যে এমন বক্তব্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।










