নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত, কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি শুরু জামায়াতের: আলোচনায় তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব
- Update Time : ১১:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫
- / ১৪২ Time View

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যেই প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে ২৯৮টি আসনে। শুধু গাজীপুর-৬ এবং নরসিংদী-৫ আসনে এখনো প্রার্থী নির্ধারণ বাকি রয়েছে। প্রায় চার মাস আগেই নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি শুরু করেছে দলটি। এবার তাদের নজর নিচু পর্যায়ে—অর্থাৎ কেন্দ্রভিত্তিক সাংগঠনিক জোরদারকরণে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গঠন করা হচ্ছে প্রশিক্ষিত টিম, যারা নির্বাচনী প্রচারণা, পোলিং এজেন্টদের সমন্বয় ও কেন্দ্র সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
প্রার্থী চূড়ান্ত ও নির্বাচনী লক্ষ্য
দলীয় উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, জেলার ভোট, উপজেলা কমিটি এবং কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২৯৮ আসনের প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তালিকা এখনও চূড়ান্ত নয়—সমমনা ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা হলে কিছু আসনে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে।
জামায়াতের নির্বাচনী লক্ষ্য, ‘ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের চেতনায় ন্যায় ও সমতাভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।’ দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, জনগণের ভোটে পরিবর্তনের জোয়ার আসছে, এবং এই পরিবর্তনে ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তরুণ নেতৃত্বের উত্থান
অতীতে জামায়াতে নেতৃত্বের শীর্ষে প্রবীণ নেতাদের আধিপত্য দেখা গেলেও এবার ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠছে। ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী তরুণ প্রার্থীদের সামনে এনে ‘ইসলামী রাজনীতির আধুনিক রূপ’ প্রদর্শনের চেষ্টা করছে দলটি। দলীয় প্রচার কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন—বিতর্ক নয়, বরং নীরব প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং স্থানীয় উন্নয়নকেন্দ্রিক বার্তা প্রচারে গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।
ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৪ (কসবা–আখাউড়া) আসনে মনোনীত প্রার্থী, বলেন,
“একসময় সভায় শুধু আমরাই উপস্থিত থাকতাম, সাধারণ মানুষ আসত না। এখন গ্রামে গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় উঠান বৈঠক করছি। মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি, যা আগে কল্পনাও করিনি।”
মাঠ পর্যায়ের তৎপরতা
জামায়াত প্রার্থীরা বর্তমানে স্থানীয়ভাবে বিনা মূল্যে চিকিৎসা কার্যক্রম, দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এসবের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে ‘ইসলামী সমাজসেবা’ ভাবমূর্তি তৈরি করাই লক্ষ্য।
style="text-align: justify;">শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণ
এই নির্বাচনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ২০ জন সদস্যের মধ্যে ১৫ জন সরাসরি প্রার্থী হচ্ছেন।
- আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা–১৫ আসনে
- সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা–৫ আসনে
- নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান রাজশাহী–১
- এ টি এম আজহারুল ইসলাম রংপুর–২
- সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কুমিল্লা–১১
এ ছাড়া আরও এক ডজন শীর্ষ নেতা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালাচ্ছেন।
আলোচিত ও বিতর্কিত প্রার্থী
এবারের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক শীর্ষ নেতারা—শফিকুল ইসলাম মাসুদ (পটুয়াখালী–২), শিশির মনির (সুনামগঞ্জ–২), দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী (ঠাকুরগাঁও–১) ও রেজাউল করিম (লক্ষ্মীপুর–৩)।
তাদের মধ্যে শিশির মনির অতীতে ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের তরুণ আইনজীবী হিসেবে আলোচিত ছিলেন, আর দেলাওয়ার সাঈদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়ে দলের মধ্যে ‘নির্যাতিত নেতা’ হিসেবে পরিচিতি পান।
এছাড়া আলোচিত ইসলামি বক্তা আমির হামযাকে কুষ্টিয়া–৩ আসনে প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে। তিনি সম্প্রতি বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে সমালোচিত হলেও দল তাকে সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দণ্ডিত নেতাদের সন্তানরাও ময়দানে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াত নেতাদের সন্তানদের মধ্য থেকেও প্রার্থী করা হয়েছে কয়েকজনকে।
- মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান মোমিন (পাবনা–১)
- দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দুই ছেলে মাসুদ সাঈদী (পিরোজপুর–১) ও শামীম সাঈদী (পিরোজপুর–২)
- মীর কাসেম আলীর ছেলে আইনজীবী মীর আহমদ বিন আরমান (ঢাকা–১৪)
তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে এলাকায় প্রচারণা শুরু করেছেন এবং জনসংযোগ কার্যক্রম জোরদার করছেন।
প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ ও নতুন চিন্তা
জামায়াত এবার প্রথমবারের মতো ‘বাইরের’ জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রার্থী করার কথা ভাবছে—এমনকি অমুসলিম প্রার্থী নিয়েও আলোচনা চলছে। এটি দলের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রম উদাহরণ হতে পারে। তবে এ নিয়ে কিছু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও দেখা দিয়েছে।
পাবনা–৫ ও ময়মনসিংহ–৬ আসনে প্রার্থী নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে, যদিও দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থী পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
নির্বাচনী সমীকরণে জামায়াত
দলটি এককভাবে নির্বাচন প্রস্তুতি নিলেও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে। ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম জামায়াত পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী কাঠামো নিয়ে মাঠে নামছে। তারা চায়, ইসলামপন্থী ভোটগুলো যেন একত্র থাকে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের একাধিক আসনে তারা “শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা” গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস করছে।
নেতাদের আশাবাদ
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন,
“এবার মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন। আগের তুলনায় সভা–সমাবেশে কয়েকগুণ বেশি মানুষের উপস্থিতি পাচ্ছি। মানুষ নতুন নেতৃত্ব, নতুন রাষ্ট্রচেতনা চায়। তারা বলছে—যা দেখেছি, তা যেন আর না আসে। জামায়াতকে পরীক্ষা করা হয়নি। আমরা সেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত।”
জামায়াতে ইসলামী এবার নির্বাচনী মাঠে যে ধরনের তৎপরতা দেখাচ্ছে, তা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত ও সংগঠিত। তরুণ নেতৃত্ব, সামাজিক প্রচারণা ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত কাঠামো—সব মিলিয়ে দলটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে আছে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রস্তুতি মাঠের ভোটে কতটা ফলপ্রসূ হয় এবং জনগণ তাদের “পরীক্ষা” দিতে প্রস্তুত কি না—সেই উত্তর মিলবে নির্বাচনের দিনেই।
সুত্রঃ প্রথম আলো










