সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশেষ পেমেন্ট স্কিমে টাকা ফেরত পাবেন একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:২০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ২১৬ Time View

d85861944bd8fc37ada056a180c76944 68cf7d546ddce

d85861944bd8fc37ada056a180c76944 68cf7d546ddce

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে। দেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় যাতে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ পেমেন্ট স্কিম চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা ধাপে ধাপে তাদের টাকা ফেরত পাবেন।

আমানতকারীদের সুরক্ষা পরিকল্পনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মোট আমানত বর্তমানে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ঋণ প্রদানের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি আমানতকারীদের হাতে রয়েছে, আর বাকি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক আমানত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

  • লাখ টাকার মধ্যে আমানত থাকলে তা ডিপোজিট ইনসুরেন্স স্কিমের আওতায় দ্রুত ফেরত দেওয়া হবে।
  • লাখ টাকার বেশি হলে ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে, তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এছাড়া একীভূত ব্যাংকের সময় আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হারে রিটার্ন পেতে পারেন। তবে বিদ্যমান সব আমানত স্কিম বাতিল হয়ে যাবে। একাধিক ব্যাংকে হিসাব থাকলেও তা একটি হিসাব হিসেবে ধরা হবে এবং বীমার সীমা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে।

অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের নগদ অর্থের পরিবর্তে নতুন ব্যাংকের শেয়ার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকবে—যারা কিস্তি দিচ্ছেন, তারা নিয়মমতো চালিয়ে যেতে হবে, আর খেলাপি হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মূলধন সহায়তা ও নতুন ব্যাংকের কাঠামো

একীভূত হওয়ার পর নতুন ব্যাংকের সম্পদ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, আর পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে—

  • ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার,
  • ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে ডিপোজিট ইনসুরেন্স ফান্ড থেকে,
  • ৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে।

এ প্রক্রিয়ায় যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে, সেগুলো হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

শেয়ারবাজারে প্রভাব

পাঁচটি ব্যাংকই বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। তবে একীভূত হওয়ার পর এগুলো ডিলিস্ট করা হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা আছে, অবসায়ন বা একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিপূরণের অধিকারী নন। তবুও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করছে।

তবে বাজারে এরই মধ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের দাম ফেইস ভ্যালু ১০ টাকার বিপরীতে ৫ টাকারও নিচে নেমে এসেছে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং ছিল—

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৬৫ শতাংশ,
  • গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৩১.৪৬ শতাংশ,
  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১৮ শতাংশ,
  • এক্সিম ব্যাংকে ৩৯.২৮ শতাংশ,
  • ইউনিয়ন ব্যাংকে ৩১ শতাংশ।

শেয়ারমূল্যের পতন শুধু এই পাঁচ ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতেই পড়েছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র এক ডজন ব্যাংকের শেয়ার ফেইস ভ্যালুর উপরে লেনদেন হচ্ছে।

প্রশাসক নিয়োগ

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সময় প্রতিটি ব্যাংকের বর্তমান এমডিকে সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসকদের দায়িত্ব হবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে নির্বাহী পর্যায়ে পরিবর্তন আনা।

প্রশাসকদের অবশ্যই শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে অথবা বিশেষজ্ঞ নিয়োগের অনুমতি থাকতে হবে। নিয়োগের ঘোষণা জাতীয় দৈনিকসহ বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই একীভূতকরণ উদ্যোগ দেশের ব্যাংক খাতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও স্বল্পমেয়াদে শেয়ারবাজার ও আমানতকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংক খাতকে আরও স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করার পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা ফেরাতে সহায়ক হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বিশেষ পেমেন্ট স্কিমে টাকা ফেরত পাবেন একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা

Update Time : ১২:২০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

d85861944bd8fc37ada056a180c76944 68cf7d546ddce

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে। দেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় যাতে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ পেমেন্ট স্কিম চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা ধাপে ধাপে তাদের টাকা ফেরত পাবেন।

আমানতকারীদের সুরক্ষা পরিকল্পনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মোট আমানত বর্তমানে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ঋণ প্রদানের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি আমানতকারীদের হাতে রয়েছে, আর বাকি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক আমানত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

  • লাখ টাকার মধ্যে আমানত থাকলে তা ডিপোজিট ইনসুরেন্স স্কিমের আওতায় দ্রুত ফেরত দেওয়া হবে।
  • লাখ টাকার বেশি হলে ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে, তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এছাড়া একীভূত ব্যাংকের সময় আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হারে রিটার্ন পেতে পারেন। তবে বিদ্যমান সব আমানত স্কিম বাতিল হয়ে যাবে। একাধিক ব্যাংকে হিসাব থাকলেও তা একটি হিসাব হিসেবে ধরা হবে এবং বীমার সীমা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে।

অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের নগদ অর্থের পরিবর্তে নতুন ব্যাংকের শেয়ার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকবে—যারা কিস্তি দিচ্ছেন, তারা নিয়মমতো চালিয়ে যেতে হবে, আর খেলাপি হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মূলধন সহায়তা ও নতুন ব্যাংকের কাঠামো

একীভূত হওয়ার পর নতুন ব্যাংকের সম্পদ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, আর পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে—

  • ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার,
  • ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে ডিপোজিট ইনসুরেন্স ফান্ড থেকে,
  • ৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে।

এ প্রক্রিয়ায় যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে, সেগুলো হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

শেয়ারবাজারে প্রভাব

পাঁচটি ব্যাংকই বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। তবে একীভূত হওয়ার পর এগুলো ডিলিস্ট করা হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা আছে, অবসায়ন বা একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিপূরণের অধিকারী নন। তবুও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করছে।

তবে বাজারে এরই মধ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের দাম ফেইস ভ্যালু ১০ টাকার বিপরীতে ৫ টাকারও নিচে নেমে এসেছে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং ছিল—

  • ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৬৫ শতাংশ,
  • গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৩১.৪৬ শতাংশ,
  • সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১৮ শতাংশ,
  • এক্সিম ব্যাংকে ৩৯.২৮ শতাংশ,
  • ইউনিয়ন ব্যাংকে ৩১ শতাংশ।

শেয়ারমূল্যের পতন শুধু এই পাঁচ ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতেই পড়েছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র এক ডজন ব্যাংকের শেয়ার ফেইস ভ্যালুর উপরে লেনদেন হচ্ছে।

প্রশাসক নিয়োগ

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সময় প্রতিটি ব্যাংকের বর্তমান এমডিকে সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসকদের দায়িত্ব হবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে নির্বাহী পর্যায়ে পরিবর্তন আনা।

প্রশাসকদের অবশ্যই শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে অথবা বিশেষজ্ঞ নিয়োগের অনুমতি থাকতে হবে। নিয়োগের ঘোষণা জাতীয় দৈনিকসহ বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই একীভূতকরণ উদ্যোগ দেশের ব্যাংক খাতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও স্বল্পমেয়াদে শেয়ারবাজার ও আমানতকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংক খাতকে আরও স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করার পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা ফেরাতে সহায়ক হবে।