বিতর্কিত তিন সংসদ নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তথ্য নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন
- Update Time : ১১:৩৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৭৩ Time View

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম (২০১৪), একাদশ (২০১৮) ও দ্বাদশ (২০২৪) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে কারচুপি ও ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ করে আসছে। সম্প্রতি দায়ের করা একটি মামলার তদন্তের অংশ হিসেবেই এই তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইসির চিঠি ও তথ্য সংগ্রহের পরিধি
গতকাল (৬ আগস্ট) নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মনির হোসেন স্বাক্ষরিত একটি অফিসিয়াল চিঠি দেশের সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট তিনটি নির্বাচনে যারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের নাম, স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর (যদি থাকে), মোবাইল নম্বরসহ অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে।
জানা গেছে, প্রতি জাতীয় নির্বাচনে প্রায় দেড় হাজারের বেশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচনি আচরণবিধি বাস্তবায়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটকেন্দ্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া প্রয়োজন অনুসারে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পিবিআইর অনুরোধে তথ্য দিচ্ছে ইসি
এই তথ্যসংগ্রহের পেছনে রয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ। বিএনপি গত ২২ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করে, যেখানে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটারদের ভোটাধিকার হরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গণতন্ত্রবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ আনা হয়। মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের সদস্যবৃন্দ এবং মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পিবিআই বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে এবং এর অংশ হিসেবে তারা ইসির কাছে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইসি প্রথমে রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। এখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইসির সচিব মো. আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, “রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী সব প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়া চলছে এবং কমিশন এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করছে।”
আইন, সংবিধান ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা করা। কিন্তু গত এক দশকের তিনটি নির্বাচনেই ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে—বিশেষ করে বিরোধী দলের অংশগ্রহণহীন নির্বাচন, কেন্দ্র দখল, ভোটকেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালট ভর্তি এবং প্রশাসনের একাংশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এখন সেই নির্বাচনগুলোর মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীলদের তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে, যা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন সংবিধান রক্ষার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে কাজ করেছে। এই মামলার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হলে প্রমাণ হবে যে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরকে ব্যবহার করে কীভাবে একটি ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সম্ভাব্য প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নির্দেশনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত শুধু নির্বাচনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্তদের নয়, বরং পুরো নির্বাচনি কাঠামোর গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারে। যদি মাঠপর্যায়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও অভিযুক্ত হিসেবে প্রমাণিত হন, তবে এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতির ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে। এতে করে ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হবে রাষ্ট্র।










