আগামী রমজানের আগেই জাতীয় নির্বাচন: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ
- Update Time : ১০:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
- / ১৯৪ Time View

আগামী রমজানের পূর্বে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এমনটাই ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) রাত ৮টা ২০ মিনিটে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক গুরুত্ববহ ভাষণে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাব যে, তারা যেন যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করে আগামী রমজানের আগেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি এ বিষয়ে খুব শিগগিরই নির্বাচন কমিশনারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাব।”
তিনি জানান, নির্বাচন যেন উৎসবমুখর পরিবেশে, সর্বোচ্চ শান্তি, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, “আমরা চাচ্ছি এবারের নির্বাচন দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকুক—ভোটার উপস্থিতি, সৌহার্দ্য, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের দিক থেকে এটি যেন একটি স্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল দিন হয়।”
ড. ইউনূস বলেন, “ভোট শুধুই রাজনৈতিক অধিকার নয়, এটি নাগরিকের আত্মপ্রকাশের এক মহান সুযোগ। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বহু মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এবারের নির্বাচন হবে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। আমরা যেন আমাদের বকেয়া আনন্দ এবার মহাআনন্দে পরিণত করতে পারি।”
প্রবাসী ও নারী ভোটারদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তব্যে ড. ইউনূস প্রবাসী ভোটারদের অধিকারের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রবাসী ভাই-বোনদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে এবার সত্যিকারের পদক্ষেপ গ্রহণ হোক। দেশের অর্থনীতিকে যারা বিদেশে থেকে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া এই নির্বাচন পূর্ণতা পাবে না। তাই নির্বাচন কমিশনকে আমরা বলেছি, যেন তারা সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ নিয়ে প্রবাসী ভোটারদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে।”
নারী ভোটারদের নিয়েও বিশেষ দৃষ্টি রাখার কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, “আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে নগরের প্রতিটি কেন্দ্রে নারীরা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারেন। এবার যেন নারী ভোটারদের ঢল নামে, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”
প্রথমবারের মতো ভোটারদের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত
ড. ইউনূস বলেন, “এই নির্বাচন হবে এমন এক প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ, যারা জীবনে কখনো ভোট দিতে পারেনি। অনেকে ১৫ বছর আগে ভোটার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও কখনো কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। এবার এমন হাজার হাজার তরুণ ও নারী ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে, যারা বহুদিন ধরে শুধু প্রত্যাশাই করে এসেছে। এবার সেই প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে।”
তিনি আরও বলেন, “ভোটের দিনটি যেন নতুন প্রজন্মের জন্য একটি উৎসব হয়। আমরা চাই প্রত্যেকটি ভোটার কেন্দ্র মুখী হোক হাসি মুখে, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। যারা প্রথমবার ভোট দেবে, তাদের জন্য এটি জীবনের একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের উৎসাহ ও সংবর্ধনা জানাতে আমরা প্রস্তুত।”
নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি দেশের গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং সামষ্টিক ভবিষ্যতের নির্ধারক পর্ব। তাই আমরা চাচ্ছি, নির্বাচনকে ঘিরে কোনো সহিংসতা, হুমকি, বা ভয়ের পরিবেশ তৈরি না হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, ভোটার—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই নির্বাচন যেন সকল রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান সুযোগের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, কেউ যেন ভয় না পায়, কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে—এই লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার সকল প্রকার প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাবে।”
‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের পথে প্রথম ধাপ এই নির্বাচন
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণের শেষাংশে বলেন, “আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে যাত্রা শুরু করেছি। এই যাত্রার প্রথম ধাপই হচ্ছে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। আপনারা সকলে দোয়া করবেন, যেন এই নির্বাচন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় এবং আমরা সবাই মিলে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় এগিয়ে যেতে পারি।”
তিনি জাতির সকল নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, প্রবাসী কর্মজীবী জনগোষ্ঠী এবং নারীদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও টেকসই করে তোলেন।










