সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মুমূর্ষু অবস্থা এবং চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৩৭:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৫
  • / ২৩৪ Time View

23555 678d5e5b81beb

 

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক চরম সংকটে রয়েছে, যার পেছনে দায়ী দেশের শীর্ষ চারটি লুটেরা গ্রুপ। ব্যাংকটির মূলধনের বিপরীতে ৯৮৭.৪০ শতাংশ ঋণ নিয়ে গেছে বেক্সিমকো গ্রুপ। পাশাপাশি অ্যাননটেক্স ৩৩৫.৫০ শতাংশ, এস আলম ৩৩৫.১০ শতাংশ এবং ক্রিসেন্ট গ্রুপ ৮৯.৭০ শতাংশ ঋণ নিয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী একক গ্রাহক ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ নিতে পারার কথা। বর্তমানে জনতা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে এই চার গ্রুপের খেলাপি ঋণ ৪০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ইসলামী ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকেও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীনদের মদদে ব্যাংকটিতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এসবের পরিণতিতে জনতা ব্যাংক এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, “এই বিপুল পরিমাণ টাকা পুরোপুরি বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এবং এটি আর ফেরত আসবে না।” তিনি বলেন, “সরকারি খাতে যে দুটি ভালো ব্যাংক ছিল, তার মধ্যে বেসিক ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংক ছিল। বেসিক ব্যাংক আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আর এখন জনতা ব্যাংকও বন্ধ হওয়ার পথে।” বর্তমান সরকার লুটেরাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি হতাশ। আর কিছু বলার নেই।”

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান রোববার যুগান্তরকে বলেন, “জনতা ব্যাংকে যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা দেখে মনে হচ্ছে আসলে ব্যাংকিংয়ের কোনো কার্যক্রমই হয়নি। এটা মনে হচ্ছে, শুধুমাত্র ভল্ট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং যার যা ইচ্ছা নিয়েছে। তা না হলে কীভাবে কোনো গ্রাহক ব্যাংকটির মূলধনের প্রায় ১০০০ শতাংশ ঋণ নিতে পারেন?” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক কোথায় ছিল? আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ কী? নিশ্চয় তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পর্যবেক্ষক ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কী করেছে? ব্যাংকের এমডির কী ভূমিকা ছিল? এত নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকার পরেও, সবাই কি চোখ বন্ধ রেখেছিল?” তিনি মনে করেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি দেখলে মাথা ঠিক রাখা কঠিন। কেউ এই দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে না। গ্রাহক, ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আসতে হবে। তা না হলে ব্যাংক খাত আরও গভীর সংকটে পড়বে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণ ২২ হাজার ৮৪৮ কোটি, অ্যাননটেক্সের খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি, এস আলমের খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৭৫৫ কোটি এবং ক্রিসেন্ট গ্রুপের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।

এ প্রতিবেদনে আরও দেখা যায় যে, সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে জনতা ব্যাংকে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৬৬.১৫ শতাংশ এবং সমগ্র ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের ২১.১৭ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৭ হাজার ৫০১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৯.২০ শতাংশ। বিগত সরকারের সময়কালে ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্সসহ কয়েকটি বড় জালিয়াতি ঘটেছিল এই ব্যাংকে।

খেলাপি ঋণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, যেখানে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা বা ৩৮.৭২ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৯৬ কোটি টাকা বা ২৫.৮৯ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে ১৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেড়ে ১২ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণই ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭১ শতাংশ। ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তাতে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। হাসিনা সরকারের সময়কালে বড় অঙ্কের ঋণের একটি বড় অংশ কাগুজে কোম্পানিতে প্রদান করা হয়েছে, যা নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে। কিছু ঋণ পাচারও হয়েছে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে, যা ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণের খাতায় যোগ হচ্ছে। ফলে, সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ। তিন মাস আগে, ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা ছিল খেলাপি, এবং গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মানে হলো, গত বছরের প্রথম ৯ মাসে খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ৭ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন আইএমএফ খেলাপি ঋণ কমানোর শর্ত আরোপ করেছে, এর আসল চিত্র সামনে আসছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানোর শর্ত দিয়েছে।

এদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ঋণগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো খেলাপি হয়নি। তবে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন অনিয়ম এবং লুটপাটের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে।

তথ্যসূত্রঃ  যুগান্তর

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মুমূর্ষু অবস্থা এবং চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন

Update Time : ১০:৩৭:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৫

 

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক চরম সংকটে রয়েছে, যার পেছনে দায়ী দেশের শীর্ষ চারটি লুটেরা গ্রুপ। ব্যাংকটির মূলধনের বিপরীতে ৯৮৭.৪০ শতাংশ ঋণ নিয়ে গেছে বেক্সিমকো গ্রুপ। পাশাপাশি অ্যাননটেক্স ৩৩৫.৫০ শতাংশ, এস আলম ৩৩৫.১০ শতাংশ এবং ক্রিসেন্ট গ্রুপ ৮৯.৭০ শতাংশ ঋণ নিয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী একক গ্রাহক ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণ নিতে পারার কথা। বর্তমানে জনতা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে এই চার গ্রুপের খেলাপি ঋণ ৪০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এই গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ইসলামী ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকেও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীনদের মদদে ব্যাংকটিতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এসবের পরিণতিতে জনতা ব্যাংক এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, “এই বিপুল পরিমাণ টাকা পুরোপুরি বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এবং এটি আর ফেরত আসবে না।” তিনি বলেন, “সরকারি খাতে যে দুটি ভালো ব্যাংক ছিল, তার মধ্যে বেসিক ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংক ছিল। বেসিক ব্যাংক আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আর এখন জনতা ব্যাংকও বন্ধ হওয়ার পথে।” বর্তমান সরকার লুটেরাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি হতাশ। আর কিছু বলার নেই।”

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান রোববার যুগান্তরকে বলেন, “জনতা ব্যাংকে যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা দেখে মনে হচ্ছে আসলে ব্যাংকিংয়ের কোনো কার্যক্রমই হয়নি। এটা মনে হচ্ছে, শুধুমাত্র ভল্ট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং যার যা ইচ্ছা নিয়েছে। তা না হলে কীভাবে কোনো গ্রাহক ব্যাংকটির মূলধনের প্রায় ১০০০ শতাংশ ঋণ নিতে পারেন?” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক কোথায় ছিল? আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ কী? নিশ্চয় তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পর্যবেক্ষক ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কী করেছে? ব্যাংকের এমডির কী ভূমিকা ছিল? এত নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকার পরেও, সবাই কি চোখ বন্ধ রেখেছিল?” তিনি মনে করেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি দেখলে মাথা ঠিক রাখা কঠিন। কেউ এই দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে না। গ্রাহক, ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আসতে হবে। তা না হলে ব্যাংক খাত আরও গভীর সংকটে পড়বে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণ ২২ হাজার ৮৪৮ কোটি, অ্যাননটেক্সের খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি, এস আলমের খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৭৫৫ কোটি এবং ক্রিসেন্ট গ্রুপের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।

এ প্রতিবেদনে আরও দেখা যায় যে, সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে জনতা ব্যাংকে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৬৬.১৫ শতাংশ এবং সমগ্র ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের ২১.১৭ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৭ হাজার ৫০১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৯.২০ শতাংশ। বিগত সরকারের সময়কালে ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্সসহ কয়েকটি বড় জালিয়াতি ঘটেছিল এই ব্যাংকে।

খেলাপি ঋণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, যেখানে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা বা ৩৮.৭২ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৯৬ কোটি টাকা বা ২৫.৮৯ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে ১৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেড়ে ১২ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণই ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭১ শতাংশ। ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তাতে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। হাসিনা সরকারের সময়কালে বড় অঙ্কের ঋণের একটি বড় অংশ কাগুজে কোম্পানিতে প্রদান করা হয়েছে, যা নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে। কিছু ঋণ পাচারও হয়েছে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে, যা ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণের খাতায় যোগ হচ্ছে। ফলে, সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ। তিন মাস আগে, ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা ছিল খেলাপি, এবং গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মানে হলো, গত বছরের প্রথম ৯ মাসে খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ৭ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন আইএমএফ খেলাপি ঋণ কমানোর শর্ত আরোপ করেছে, এর আসল চিত্র সামনে আসছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানোর শর্ত দিয়েছে।

এদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ঋণগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো খেলাপি হয়নি। তবে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন অনিয়ম এবং লুটপাটের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে।

তথ্যসূত্রঃ  যুগান্তর