‘বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা আজ বহুমাত্রিক হুমকির মুখে’
- Update Time : ১২:২০:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬
- / ৮০ Time View

রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী “বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬”। শুক্রবার আয়োজিত সম্মেলনের প্রথম দিনের অধিবেশনে দেশ-বিদেশের পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক, গণমাধ্যম গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অংশ নেন। সম্মেলনের আয়োজন করে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক প্রভাব, অপতথ্যের বিস্তার, ডিজিটাল নজরদারি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে সাংবাদিকতা এখন বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। তবে এই চ্যালেঞ্জময় সময়কেই তারা নতুন পরিবর্তন ও সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইস বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিস্তর গবেষণা, বিশ্লেষণ ও সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই সময়টিই ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা আজ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। গত এক দশকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শত শত সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নিপীড়ন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক পরিবেশ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর সংগঠিত হামলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা সাংবাদিক সমাজকে হতাশ করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের সম্মেলনের মাধ্যমে সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক তথ্যব্যবস্থা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়ছে এবং সাংবাদিকরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে কাজ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
সম্মেলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক বলেন, বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি দেশ বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুতর সংকটের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অপতথ্য বিশ্বব্যাপী নাগরিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হলে সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক বা বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকতে হবে। সংবাদকক্ষের নিজস্ব নীতি, পেশাগত মানদণ্ড ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাবিষয়ক অধিবেশনে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামো ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা টেকসই হতে পারে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে গণমাধ্যমের অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই দেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিহিত। তবে অতীতে যেমন পর্যাপ্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হয়নি, বর্তমানেও তা সীমিত। ভবিষ্যতে এই ধারার সাংবাদিকতা কতটা শক্তিশালী হবে, তা অনেকটাই সম্পাদকদের স্বাধীন ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে।
অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, কানাডার টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী ফাহিম আহমেদ।
দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন গণমাধ্যম পরিবেশে সাংবাদিকতার সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যারা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও জনমুখী সাংবাদিকতা করতে চান, তাদের এসব নতুন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।




















