যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থা হুমকিতে, বাড়ছে দুর্ভিক্ষের ভয়
- Update Time : ১২:৪৭:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
- / ১২৯ Time View

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বের বহু দরিদ্র ও আমদানিনির্ভর দেশ ভয়াবহ খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব এতদিন মূলত তেল ও গ্যাসকে কেন্দ্র করে বিবেচিত হলেও বর্তমানে অঞ্চলটি বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এখন ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা সামরিক অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারমূল্যের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৫০-এর দশকের ‘সবুজ বিপ্লব’-এর পর বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থা দ্রুত শিল্পনির্ভর হয়ে ওঠে। উচ্চ ফলনশীল ধান, গম ও অন্যান্য শস্য উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেনভিত্তিক সার প্রয়োজন হয়। এসব সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। আর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস ও অ্যামোনিয়া উৎপাদন অঞ্চল হচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো।
বর্তমানে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বব্যাপী অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের মোট অ্যামোনিয়া উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। সৌদি আরব এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া রফতানিকারক দেশ। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ তাদের কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে থাকে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হলে সারের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম ৪১ শতাংশের বেশি এবং রাসায়নিক সারের দাম প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই দাম আরও বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। গম, চাল, ভোজ্যতেল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর দিয়েই ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্য পরিবহন করা হয়। এ অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে রয়েছে দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত দেশগুলো। ধনী রাষ্ট্রগুলো ভর্তুকি ও মজুত ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে পারলেও দরিদ্র দেশগুলোর সেই সক্ষমতা নেই। সুদান, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যেই খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, বর্তমানে সুদানে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী আরও প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট বিশ্বকে একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে—খাদ্য উৎপাদনে অতিরিক্তভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। টেকসই কৃষি, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করা জরুরি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা বন্ধ করা। কারণ সংঘাত অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বই ভয়াবহ খাদ্য ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। বিশ্ব নেতারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কোটি কোটি মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, এফএও, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)





















