সূরা-আল আম্বিয়ার আলোকে মানুষের সংকট ও নবীদের দোয়া
- Update Time : ১১:৫৪:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
- / ১৪২ Time View

মানুষের জীবন কখনো সরলরেখায় চলে না। সুখ-শান্তির পাশাপাশি আমাদের জীবনে বারবার নেমে আসে পরীক্ষা—রোগ, অন্ধকার, একাকীত্ব, বিপদ এবং জুলুম। এই সংকটগুলো নতুন কিছু নয়; মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই এগুলো মানুষের সঙ্গী। আর এই কারণেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র আল-কুরআন-এ এমন কিছু দোয়া সংরক্ষণ করেছেন, যা শুধু অতীতের নবীদের জন্য নয়—বরং প্রতিটি মুমিনের জন্য পথনির্দেশনা।
বিশেষ করে সূরা আম্বিয়া-তে আমরা দেখি, আল্লাহ একাধিক নবীর জীবন থেকে সংকটময় মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন এবং তাঁদের দোয়া উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি দোয়া আলাদা করে উল্লেখযোগ্য, কারণ প্রতিটির পর আল্লাহ বলেছেন—“فَاسْتَجَبْنَا لَهُ” অর্থাৎ “আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছি।” এটি কেবল ইতিহাস নয়; এটি একটি জীবন্ত বার্তা—আপনার ডাকও শোনা হয়।
প্রথম দোয়াটি হযরত আইয়ুব (আ.)-এর। দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগে ভুগেও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। তাঁর দোয়া ছিল—
“أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ”
অর্থাৎ, “আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
এই দোয়ার মধ্যে কোনো দাবি নেই, শুধু বিনয় আর আল্লাহর রহমতের প্রতি আস্থা। এর জবাবে আল্লাহ তাঁর রোগ দূর করে দিলেন, পরিবার ফিরিয়ে দিলেন, এমনকি দ্বিগুণ দান করলেন। শিক্ষা স্পষ্ট—ধৈর্য ও বিশ্বাসের সাথে বলা দোয়া কখনো বিফল হয় না।
দ্বিতীয় দোয়াটি হযরত ইউনুস (আ.)-এর। তিন স্তরের অন্ধকারে—সমুদ্র, রাত এবং মাছের পেটের মধ্যে তিনি যে দোয়া করেছিলেন তা আজও প্রতিটি মুমিনের জন্য আশার আলো—
“لَّا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ”
অর্থ: “আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”
এই দোয়ার পর আল্লাহ শুধু তাঁকেই মুক্ত করেননি, বরং ঘোষণা দিয়েছেন—“এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি।” অর্থাৎ, এই দোয়া আপনার-আমার জন্যও সমান কার্যকর।
তৃতীয় দোয়াটি হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর। বার্ধক্য ও অসম্ভব পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আশা ছাড়েননি—
অর্থ: “হে আমার রব, আমাকে একা রাখবেন না; আপনি সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।”
যেখানে মানবিক হিসাব ব্যর্থ, সেখানে আল্লাহর কুদরত কাজ করে। এই দোয়ার প্রতিদান হিসেবে তিনি সন্তান লাভ করেন—হযরত ইয়াহইয়া (আ.)।
চতুর্থ ঘটনাটি হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর। সত্যের পথে একা দাঁড়ানোর কারণে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ আগুনকেই আদেশ দিলেন—
“يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا”
অর্থ: “হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।”
এখানে শিক্ষা হলো—যখন আপনি সত্যের পথে একা হয়ে যান, তখন আল্লাহ আপনার জন্য পরিস্থিতিকেই বদলে দিতে পারেন।
পঞ্চম দোয়াটি হযরত লুত (আ.)-এর। জুলুম ও অনাচারের বিরুদ্ধে অসহায় অবস্থায় তিনি বলেছিলেন—
“رَبِّ انصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ”
অর্থ: “হে আমার রব, ফাসাদকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।”
আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দেন, তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করেন এবং জালিমদের ধ্বংস করেন।
এই পাঁচটি দোয়া আমাদের জীবনের পাঁচটি বাস্তব সংকটের প্রতিচ্ছবি—রোগ, অন্ধকার, অপূর্ণতা, একাকীত্ব ও জুলুম। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নবীরা কখনো মানুষের কাছে নয়, ক্ষমতার কাছে নয়, সম্পদের কাছে নয়—শুধু আল্লাহর কাছেই ফিরে গেছেন।
এই দোয়াগুলো কেবল ইতিহাসের অংশ নয়; এগুলো জীবনের গাইডলাইন। আমরা যখন বিপদে পড়ি, তখন কী বলতে হবে, কীভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে—তা নিজেই আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। তাই আমাদের দায়িত্ব শুধু একটি—এই দোয়াগুলোকে জীবনের অংশ করে নেওয়া।
শেষে একটি প্রার্থনা—
ইয়া আল্লাহ, আমাদের জীবনের প্রতিটি সংকটে নবীদের দোয়া স্মরণ করার তাওফিক দিন, আমাদের ডাকে সাড়া দিন, আমাদের কষ্ট দূর করুন। আমিন।






















