সময়: রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সূরা-আল আম্বিয়ার আলোকে মানুষের সংকট ও নবীদের দোয়া

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:৫৪:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৪১ Time View

মানুষের জীবন কখনো সরলরেখায় চলে না। সুখ-শান্তির পাশাপাশি আমাদের জীবনে বারবার নেমে আসে পরীক্ষা—রোগ, অন্ধকার, একাকীত্ব, বিপদ এবং জুলুম। এই সংকটগুলো নতুন কিছু নয়; মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই এগুলো মানুষের সঙ্গী। আর এই কারণেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র আল-কুরআন-এ এমন কিছু দোয়া সংরক্ষণ করেছেন, যা শুধু অতীতের নবীদের জন্য নয়—বরং প্রতিটি মুমিনের জন্য পথনির্দেশনা।

বিশেষ করে সূরা আম্বিয়া-তে আমরা দেখি, আল্লাহ একাধিক নবীর জীবন থেকে সংকটময় মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন এবং তাঁদের দোয়া উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি দোয়া আলাদা করে উল্লেখযোগ্য, কারণ প্রতিটির পর আল্লাহ বলেছেন—“فَاسْتَجَبْنَا لَهُ” অর্থাৎ “আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছি।” এটি কেবল ইতিহাস নয়; এটি একটি জীবন্ত বার্তা—আপনার ডাকও শোনা হয়।

প্রথম দোয়াটি হযরত আইয়ুব (আ.)-এর। দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগে ভুগেও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। তাঁর দোয়া ছিল—
“أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ”
অর্থাৎ, “আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
এই দোয়ার মধ্যে কোনো দাবি নেই, শুধু বিনয় আর আল্লাহর রহমতের প্রতি আস্থা। এর জবাবে আল্লাহ তাঁর রোগ দূর করে দিলেন, পরিবার ফিরিয়ে দিলেন, এমনকি দ্বিগুণ দান করলেন। শিক্ষা স্পষ্ট—ধৈর্য ও বিশ্বাসের সাথে বলা দোয়া কখনো বিফল হয় না।

দ্বিতীয় দোয়াটি হযরত ইউনুস (আ.)-এর। তিন স্তরের অন্ধকারে—সমুদ্র, রাত এবং মাছের পেটের মধ্যে তিনি যে দোয়া করেছিলেন তা আজও প্রতিটি মুমিনের জন্য আশার আলো—
“لَّا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ”
অর্থ: “আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”
এই দোয়ার পর আল্লাহ শুধু তাঁকেই মুক্ত করেননি, বরং ঘোষণা দিয়েছেন—“এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি।” অর্থাৎ, এই দোয়া আপনার-আমার জন্যও সমান কার্যকর।

তৃতীয় দোয়াটি হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর। বার্ধক্য ও অসম্ভব পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আশা ছাড়েননি—

/> “رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ”
অর্থ: “হে আমার রব, আমাকে একা রাখবেন না; আপনি সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।”
যেখানে মানবিক হিসাব ব্যর্থ, সেখানে আল্লাহর কুদরত কাজ করে। এই দোয়ার প্রতিদান হিসেবে তিনি সন্তান লাভ করেন—হযরত ইয়াহইয়া (আ.)।

চতুর্থ ঘটনাটি হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর। সত্যের পথে একা দাঁড়ানোর কারণে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ আগুনকেই আদেশ দিলেন—
“يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا”
অর্থ: “হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।”
এখানে শিক্ষা হলো—যখন আপনি সত্যের পথে একা হয়ে যান, তখন আল্লাহ আপনার জন্য পরিস্থিতিকেই বদলে দিতে পারেন।

পঞ্চম দোয়াটি হযরত লুত (আ.)-এর। জুলুম ও অনাচারের বিরুদ্ধে অসহায় অবস্থায় তিনি বলেছিলেন—
“رَبِّ انصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ”
অর্থ: “হে আমার রব, ফাসাদকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।”
আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দেন, তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করেন এবং জালিমদের ধ্বংস করেন।

এই পাঁচটি দোয়া আমাদের জীবনের পাঁচটি বাস্তব সংকটের প্রতিচ্ছবি—রোগ, অন্ধকার, অপূর্ণতা, একাকীত্ব ও জুলুম। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নবীরা কখনো মানুষের কাছে নয়, ক্ষমতার কাছে নয়, সম্পদের কাছে নয়—শুধু আল্লাহর কাছেই ফিরে গেছেন।

এই দোয়াগুলো কেবল ইতিহাসের অংশ নয়; এগুলো জীবনের গাইডলাইন। আমরা যখন বিপদে পড়ি, তখন কী বলতে হবে, কীভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে—তা নিজেই আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। তাই আমাদের দায়িত্ব শুধু একটি—এই দোয়াগুলোকে জীবনের অংশ করে নেওয়া।

শেষে একটি প্রার্থনা—
ইয়া আল্লাহ, আমাদের জীবনের প্রতিটি সংকটে নবীদের দোয়া স্মরণ করার তাওফিক দিন, আমাদের ডাকে সাড়া দিন, আমাদের কষ্ট দূর করুন। আমিন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

সূরা-আল আম্বিয়ার আলোকে মানুষের সংকট ও নবীদের দোয়া

Update Time : ১১:৫৪:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

মানুষের জীবন কখনো সরলরেখায় চলে না। সুখ-শান্তির পাশাপাশি আমাদের জীবনে বারবার নেমে আসে পরীক্ষা—রোগ, অন্ধকার, একাকীত্ব, বিপদ এবং জুলুম। এই সংকটগুলো নতুন কিছু নয়; মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই এগুলো মানুষের সঙ্গী। আর এই কারণেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র আল-কুরআন-এ এমন কিছু দোয়া সংরক্ষণ করেছেন, যা শুধু অতীতের নবীদের জন্য নয়—বরং প্রতিটি মুমিনের জন্য পথনির্দেশনা।

বিশেষ করে সূরা আম্বিয়া-তে আমরা দেখি, আল্লাহ একাধিক নবীর জীবন থেকে সংকটময় মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন এবং তাঁদের দোয়া উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি দোয়া আলাদা করে উল্লেখযোগ্য, কারণ প্রতিটির পর আল্লাহ বলেছেন—“فَاسْتَجَبْنَا لَهُ” অর্থাৎ “আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছি।” এটি কেবল ইতিহাস নয়; এটি একটি জীবন্ত বার্তা—আপনার ডাকও শোনা হয়।

প্রথম দোয়াটি হযরত আইয়ুব (আ.)-এর। দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগে ভুগেও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। তাঁর দোয়া ছিল—
“أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ”
অর্থাৎ, “আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
এই দোয়ার মধ্যে কোনো দাবি নেই, শুধু বিনয় আর আল্লাহর রহমতের প্রতি আস্থা। এর জবাবে আল্লাহ তাঁর রোগ দূর করে দিলেন, পরিবার ফিরিয়ে দিলেন, এমনকি দ্বিগুণ দান করলেন। শিক্ষা স্পষ্ট—ধৈর্য ও বিশ্বাসের সাথে বলা দোয়া কখনো বিফল হয় না।

দ্বিতীয় দোয়াটি হযরত ইউনুস (আ.)-এর। তিন স্তরের অন্ধকারে—সমুদ্র, রাত এবং মাছের পেটের মধ্যে তিনি যে দোয়া করেছিলেন তা আজও প্রতিটি মুমিনের জন্য আশার আলো—
“لَّا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ”
অর্থ: “আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”
এই দোয়ার পর আল্লাহ শুধু তাঁকেই মুক্ত করেননি, বরং ঘোষণা দিয়েছেন—“এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি।” অর্থাৎ, এই দোয়া আপনার-আমার জন্যও সমান কার্যকর।

তৃতীয় দোয়াটি হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর। বার্ধক্য ও অসম্ভব পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আশা ছাড়েননি—

/> “رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ”
অর্থ: “হে আমার রব, আমাকে একা রাখবেন না; আপনি সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।”
যেখানে মানবিক হিসাব ব্যর্থ, সেখানে আল্লাহর কুদরত কাজ করে। এই দোয়ার প্রতিদান হিসেবে তিনি সন্তান লাভ করেন—হযরত ইয়াহইয়া (আ.)।

চতুর্থ ঘটনাটি হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর। সত্যের পথে একা দাঁড়ানোর কারণে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ আগুনকেই আদেশ দিলেন—
“يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا”
অর্থ: “হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।”
এখানে শিক্ষা হলো—যখন আপনি সত্যের পথে একা হয়ে যান, তখন আল্লাহ আপনার জন্য পরিস্থিতিকেই বদলে দিতে পারেন।

পঞ্চম দোয়াটি হযরত লুত (আ.)-এর। জুলুম ও অনাচারের বিরুদ্ধে অসহায় অবস্থায় তিনি বলেছিলেন—
“رَبِّ انصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ”
অর্থ: “হে আমার রব, ফাসাদকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।”
আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দেন, তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করেন এবং জালিমদের ধ্বংস করেন।

এই পাঁচটি দোয়া আমাদের জীবনের পাঁচটি বাস্তব সংকটের প্রতিচ্ছবি—রোগ, অন্ধকার, অপূর্ণতা, একাকীত্ব ও জুলুম। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নবীরা কখনো মানুষের কাছে নয়, ক্ষমতার কাছে নয়, সম্পদের কাছে নয়—শুধু আল্লাহর কাছেই ফিরে গেছেন।

এই দোয়াগুলো কেবল ইতিহাসের অংশ নয়; এগুলো জীবনের গাইডলাইন। আমরা যখন বিপদে পড়ি, তখন কী বলতে হবে, কীভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে—তা নিজেই আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন। তাই আমাদের দায়িত্ব শুধু একটি—এই দোয়াগুলোকে জীবনের অংশ করে নেওয়া।

শেষে একটি প্রার্থনা—
ইয়া আল্লাহ, আমাদের জীবনের প্রতিটি সংকটে নবীদের দোয়া স্মরণ করার তাওফিক দিন, আমাদের ডাকে সাড়া দিন, আমাদের কষ্ট দূর করুন। আমিন।