মহাকাশে ডাটা সেন্টার চালুর পরিকল্পনা গুগলের
- Update Time : ০৭:০০:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
- / ৩১০ Time View

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন প্রযুক্তি জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু এই বিপ্লবের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও শক্তির প্রয়োজন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল। তারা মহাকাশে সৌরশক্তিচালিত ডাটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যার নাম দিয়েছে ‘প্রজেক্ট সানক্যাচার (Project SunCatcher)’।
সৌরশক্তিচালিত স্যাটেলাইটে এআই প্রসেসিং
গুগলের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো টেনসর প্রসেসিং ইউনিট (TPU) সজ্জিত স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মহাকাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালানোর উপযোগী ডাটা সেন্টার স্থাপন করা। এসব স্যাটেলাইট সম্পূর্ণভাবে সৌরশক্তি দ্বারা পরিচালিত হবে, ফলে পৃথিবীর বিদ্যুৎ নির্ভর অবকাঠামোর ওপর চাপ কমবে।
গবেষকদের মতে, মহাকাশে সৌর প্যানেল পৃথিবীর তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম, কারণ সেখানে সূর্যালোকের প্রতিবন্ধকতা নেই। ফলে ২৪ ঘণ্টার প্রায় পুরো সময়ই নিরবচ্ছিন্ন শক্তি পাওয়া সম্ভব।
পরিবেশবান্ধব বিকল্পের সন্ধান
গুগল বলছে, এআই ট্রেনিং ও প্রসেসিংয়ের জন্য বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হয়। পৃথিবীতে ডাটা সেন্টারগুলো যে হারে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তা পরিবেশ দূষণ ও গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। তাই মহাকাশে ডাটা সেন্টার গড়ে তোলার মাধ্যমে একদিকে শক্তির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে, অন্যদিকে পৃথিবীর পরিবেশগত চাপও অনেকটা হ্রাস পাবে।
গুগলের প্রকৌশলী ট্র্যাভিস বিলস বলেন, “ভবিষ্যতে, মহাকাশ হতে পারে এআই কম্পিউটিং ক্ষমতা বৃদ্ধির সর্বোত্তম স্থান। আমরা শুধু পৃথিবী নয়, মহাকাশকেও শক্তির উৎস হিসেবে দেখতে চাই।”
মহাকাশে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
তবে এ উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়নে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মহাকাশে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন বা বিকিরণ যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্ষতি করতে পারে। এজন্য গুগলের বিজ্ঞানীরা মহাকাশের বিকিরণ সহ্য করার মতো টিপিইউ তৈরি ও পরীক্ষা করছেন।
গবেষণা অনুযায়ী, ট্রিলিয়াম টিপিইউ (Trillium TPU) প্রযুক্তি পাঁচ বছরের মিশন চলাকালীন বিকিরণের চাপেও স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে এবং কার্যক্ষমতা হারায় না।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: সবচেয়ে বড় বাধা
মহাকাশে ডাটা সেন্টার চালু হলেও পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে কঠিন বিষয়। কারণ বিশাল দূরত্বে তথ্য আদান–প্রদান করতে অত্যন্ত দ্রুতগতির ও নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। গুগল এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পনা করছে স্যাটেলাইট লেজার লিংক (Laser Link) প্রযুক্তি ব্যবহারের, যা প্রতি সেকেন্ডে ১০ টেরাবাইট পর্যন্ত ডাটা স্থানান্তর করতে পারবে।
তবে এজন্য স্যাটেলাইটগুলোকে একে অপরের খুব কাছাকাছি—মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে—অবস্থান করতে হবে। এতে মহাকাশে আবর্জনা বা স্যাটেলাইট সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
খরচ ও সম্ভাবনা
মহাকাশে ডাটা সেন্টার পাঠানোর সবচেয়ে বড় বাধা হলো ব্যয়। বর্তমানে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে গুগল আশাবাদী যে, রকেট উৎক্ষেপণের খরচ ক্রমাগত কমছে, ফলে আগামী দশকে এই প্রকল্প বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হয়ে উঠবে। কোম্পানিটির ধারণা, ২০৩০ সালের মাঝামাঝি সময়েই মহাকাশভিত্তিক ডাটা সেন্টারের পরিচালন খরচ পৃথিবীর সমান হয়ে যাবে।
প্রতিযোগিতায় অন্যান্য টেক জায়ান্ট
গুগল একা নয় এই প্রতিযোগিতায়। স্পেসএক্স, অ্যামাজন, এমনকি মাইক্রোসফট-ও ভবিষ্যতে মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আগামী দশকের মধ্যেই পৃথিবীর বাইরের কক্ষপথে শত শত ছোট আকারের ডাটা সেন্টার তৈরি হবে, যা পৃথিবীর ইন্টারনেট অবকাঠামোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
গুগলের ‘প্রজেক্ট সানক্যাচার’ শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, এটি শক্তি সংকট, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতের কম্পিউটিং ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলেই কেবল মানবসভ্যতা এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে—যেখানে ডাটা সেন্টার আর পৃথিবীতে নয়, বরং মহাকাশেই ভেসে থাকবে।






















