বিশ্বব্যাংকের ৪৫ কোটি ডলারের ঋণ: ব্যাংক খাতের সংস্কার হবে, নাকি আবারও লুটপাটের নতুন অধ্যায়?
- Update Time : ০৫:৫৫:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- / ১৩৬ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক গভীর আস্থার সংকটে নিমজ্জিত। একসময় দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত এই খাত এখন খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নামসর্বস্ব ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের উদ্বেগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এমন এক সময়ে বিশ্বব্যাংক ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই অর্থ কি সত্যিই ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ব্যয় হবে, নাকি অতীতের মতো নতুন করে লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করবে?
বিশ্বব্যাংক বলছে, এই অর্থের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমানোর ভিত্তি তৈরি, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা। কাগজে-কলমে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা কি সেই আশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
গত এক যুগে দেশের ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। অনেক ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য আমানতকারী দিনের পর দিন নিজেদের অর্থ তুলতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার টাকা পাচ্ছেন না, কেউ সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারছেন না, কেউ আবার অবসরের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে।
প্রশ্ন হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ীদের কতজনের বিচার হয়েছে? কতজন ঋণখেলাপিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে? কত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা গেছে? যদি এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তাহলে নতুন ঋণ নিয়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশেরও বেশি। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ব্যাংকিং খাতের গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। যখন একটি ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারে না, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।
আজ দেশের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করছেন তা হলো—আমাদের টাকা কি নিরাপদ? আমানতকারীরা কি নিশ্চয়তা পাবেন যে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক হঠাৎ তারল্য সংকটে পড়ে তাদের সঞ্চিত অর্থ আটকে রাখবে না? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনো এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।
বিশ্বব্যাংকের ঋণ তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সঙ্গে কঠোর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা যুক্ত হবে। শুধুমাত্র নতুন সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ কিংবা কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করতে পারবে না। প্রয়োজন—
- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা;
- ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা;
- অর্থপাচারকারীদের সম্পদ জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনা;
- পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিদের নিয়োগ;
- বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা;
- এবং সর্বোপরি, আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের মানুষ আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদ কি না। তারা দেখতে চায়, যারা ব্যাংক লুট করেছে তাদের বিচার হচ্ছে কি না।
৪৫ কোটি ডলারের এই ঋণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নতুন সুযোগ হতে পারে। তবে এটি আরেকটি ব্যর্থ সংস্কার কর্মসূচি বা নতুন লুটপাটের অধ্যায়ে পরিণত হলে তার মূল্য শুধু অর্থনীতিই নয়, দেশের কোটি কোটি আমানতকারীকে দিতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা কোনো অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তি পুনর্গঠনের সময় এখনই। অন্যথায় আরও ঋণ আসবে, আরও সংস্কারের কথা বলা হবে, কিন্তু আমানতকারীদের চোখের উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা কখনোই দূর হবে না।

















