Advertisement
সময়: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দৃষ্টি অবনত রাখার রহস্য: নূর, প্রজ্ঞা ও আত্মিক শক্তির উৎস

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১২:৪২:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৮১ Time View

 

ইসলাম মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি সংযত রাখা বা চোখের হেফাজত করা একটি মৌলিক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনা। অনেকেই মনে করেন এটি কেবল চারিত্রিক শুদ্ধতার জন্য, কিন্তু বাস্তবে এর উপকারিতা বহুমাত্রিক—আত্মিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং পরকালীন। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর: ৩০)

আরও বলেন:
“মুমিন নারীদেরকেও বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর: ৩১)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“চোখের যিনাও রয়েছে, আর তার যিনা হলো (হারামের দিকে) তাকানো।”
— (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

নিম্নে দৃষ্টি সংযত রাখার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার তুলে ধরা হলো—

১. আক্ষেপ ও হতাশা কমে:
যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে না, সে দুনিয়ার চাকচিক্যে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে তার অন্তরে সবসময় না পাওয়ার কষ্ট, হাহাকার ও হতাশা কাজ করে। পক্ষান্তরে, দৃষ্টি সংযত রাখলে অন্তর প্রশান্ত থাকে এবং অপ্রাপ্তির বেদনা কমে যায়।

২. অন্তরে নূর সৃষ্টি হয়:
দৃষ্টি হেফাজত করলে আল্লাহ অন্তরে নূর দান করেন। হাদিসে এসেছে, “তুমি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করলে, আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।”
এই নূর মানুষকে সঠিক-ভুল বুঝতে সাহায্য করে। বিপরীতে, অবাধ দৃষ্টি অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে।

৩. দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি পায়:
যে ব্যক্তি নিজের চোখকে হারাম থেকে বাঁচায়, আল্লাহ তাকে হিকমাহ (প্রজ্ঞা) দান করেন। ইমাম ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) উল্লেখ করেছেন, দৃষ্টি সংযম মানুষের অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এনে দেয়।

৪. ইলম ও হিকমতের দরজা উন্মুক্ত হয়:
হারাম থেকে বিরত থাকা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন।”
— (সূরা আল-আনফাল: ২৯)

এই ‘ফুরকান’ বা পার্থক্য করার শক্তি মূলত অন্তরের নূরের ফল।

৫. আত্মা শক্তিশালী ও পরিশুদ্ধ হয়:
দৃষ্টি সংযত রাখলে মানুষের আত্মা পবিত্র হয় এবং নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। এতে আত্মিক দৃঢ়তা ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।

৬. ইবাদতে তৃপ্তি ও আনন্দ বৃদ্ধি পায়:
যে ব্যক্তি দৃষ্টি সংযত রাখে, সে ইবাদতে বেশি স্বাদ পায়। কারণ হারাম দৃষ্টি হৃদয়কে কঠিন করে তোলে এবং ইবাদতের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, সংযম ইবাদতের মাধুর্য বাড়ায়।

৭. জাহান্নাম থেকে রক্ষা লাভ:
দৃষ্টি অনেক গুনাহের সূচনা করে। হারাম দৃষ্টি থেকে চিন্তা, তারপর কাজ—এভাবেই মানুষ পাপের দিকে ধাবিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“চোখের দৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের একটি।”
— (তাবরানি)

অতএব, চোখের হেফাজত মানুষকে বড় গুনাহ থেকে রক্ষা করে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ সুগম করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে দৃষ্টি সংযম সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট যুবসমাজকে সহজেই হারামের দিকে টেনে নিচ্ছে। ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মিক উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ সবই হুমকির মুখে পড়ছে।

দৃষ্টি সংযত রাখা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে আত্মিক উন্নতি, মানসিক প্রশান্তি এবং নৈতিক দৃঢ়তা প্রদান করে। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে চললে একজন ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই সফল হতে পারে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে দৃষ্টি সংযত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

দৃষ্টি অবনত রাখার রহস্য: নূর, প্রজ্ঞা ও আত্মিক শক্তির উৎস

Update Time : ১২:৪২:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

 

ইসলাম মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি সংযত রাখা বা চোখের হেফাজত করা একটি মৌলিক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনা। অনেকেই মনে করেন এটি কেবল চারিত্রিক শুদ্ধতার জন্য, কিন্তু বাস্তবে এর উপকারিতা বহুমাত্রিক—আত্মিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং পরকালীন। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর: ৩০)

আরও বলেন:
“মুমিন নারীদেরকেও বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর: ৩১)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“চোখের যিনাও রয়েছে, আর তার যিনা হলো (হারামের দিকে) তাকানো।”
— (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

নিম্নে দৃষ্টি সংযত রাখার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার তুলে ধরা হলো—

১. আক্ষেপ ও হতাশা কমে:
যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে না, সে দুনিয়ার চাকচিক্যে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে তার অন্তরে সবসময় না পাওয়ার কষ্ট, হাহাকার ও হতাশা কাজ করে। পক্ষান্তরে, দৃষ্টি সংযত রাখলে অন্তর প্রশান্ত থাকে এবং অপ্রাপ্তির বেদনা কমে যায়।

২. অন্তরে নূর সৃষ্টি হয়:
দৃষ্টি হেফাজত করলে আল্লাহ অন্তরে নূর দান করেন। হাদিসে এসেছে, “তুমি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করলে, আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।”
এই নূর মানুষকে সঠিক-ভুল বুঝতে সাহায্য করে। বিপরীতে, অবাধ দৃষ্টি অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে।

৩. দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি পায়:
যে ব্যক্তি নিজের চোখকে হারাম থেকে বাঁচায়, আল্লাহ তাকে হিকমাহ (প্রজ্ঞা) দান করেন। ইমাম ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) উল্লেখ করেছেন, দৃষ্টি সংযম মানুষের অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এনে দেয়।

৪. ইলম ও হিকমতের দরজা উন্মুক্ত হয়:
হারাম থেকে বিরত থাকা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন।”
— (সূরা আল-আনফাল: ২৯)

এই ‘ফুরকান’ বা পার্থক্য করার শক্তি মূলত অন্তরের নূরের ফল।

৫. আত্মা শক্তিশালী ও পরিশুদ্ধ হয়:
দৃষ্টি সংযত রাখলে মানুষের আত্মা পবিত্র হয় এবং নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। এতে আত্মিক দৃঢ়তা ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।

৬. ইবাদতে তৃপ্তি ও আনন্দ বৃদ্ধি পায়:
যে ব্যক্তি দৃষ্টি সংযত রাখে, সে ইবাদতে বেশি স্বাদ পায়। কারণ হারাম দৃষ্টি হৃদয়কে কঠিন করে তোলে এবং ইবাদতের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, সংযম ইবাদতের মাধুর্য বাড়ায়।

৭. জাহান্নাম থেকে রক্ষা লাভ:
দৃষ্টি অনেক গুনাহের সূচনা করে। হারাম দৃষ্টি থেকে চিন্তা, তারপর কাজ—এভাবেই মানুষ পাপের দিকে ধাবিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“চোখের দৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের একটি।”
— (তাবরানি)

অতএব, চোখের হেফাজত মানুষকে বড় গুনাহ থেকে রক্ষা করে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ সুগম করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট:
বর্তমান ডিজিটাল যুগে দৃষ্টি সংযম সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্ট যুবসমাজকে সহজেই হারামের দিকে টেনে নিচ্ছে। ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মিক উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ সবই হুমকির মুখে পড়ছে।

দৃষ্টি সংযত রাখা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে আত্মিক উন্নতি, মানসিক প্রশান্তি এবং নৈতিক দৃঢ়তা প্রদান করে। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে চললে একজন ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই সফল হতে পারে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে দৃষ্টি সংযত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।