সময়: সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক চাপের মুখে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা প্রশ্নবিদ্ধ: ড. ইফতেখারুজ্জামান

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:১১:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৬২ Time View

 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগে স্পষ্ট দুর্বলতা দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই দৃঢ় ও স্বাধীন অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন—উভয় পরিসরেই আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন ও অনিয়ম সংঘটিত হলেও ইসি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, অস্পষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এর ফলে পুরো নির্বাচন ও গণভোট প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

 

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টিআইবির তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার মতে, গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট অপসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থ বা ‘মানি ডিপেন্ডেন্সি’ বড় ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের পর্যাপ্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সমন্বয় না থাকায় ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণও সম্ভব হচ্ছে না।

গণভোট ইস্যুতে সরকারের ভূমিকাকেও তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দোদুল্যমান অবস্থানে ছিল। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রশ্নকে আরও বেশি অস্পষ্ট করেছে।

তিনি বলেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় আইনি বিচ্যুতি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—নির্বাচন কমিশন গণভোটকে ‘নির্বাচন’-এর সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করছে। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমার্থক নয়, কারণ এখানে কোনো ব্যক্তি বা আসনের পক্ষে ভোট প্রদান করা হয় না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশনা দিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নেওয়া জরুরি ছিল।

তার মতে, ইসি এ ক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোট পরিচালনায় অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

রাজনৈতিক চাপের মুখে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা প্রশ্নবিদ্ধ: ড. ইফতেখারুজ্জামান

Update Time : ০২:১১:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগে স্পষ্ট দুর্বলতা দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই দৃঢ় ও স্বাধীন অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন—উভয় পরিসরেই আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন ও অনিয়ম সংঘটিত হলেও ইসি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, অস্পষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এর ফলে পুরো নির্বাচন ও গণভোট প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

 

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টিআইবির তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার মতে, গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট অপসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থ বা ‘মানি ডিপেন্ডেন্সি’ বড় ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের পর্যাপ্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সমন্বয় না থাকায় ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণও সম্ভব হচ্ছে না।

গণভোট ইস্যুতে সরকারের ভূমিকাকেও তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দোদুল্যমান অবস্থানে ছিল। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রশ্নকে আরও বেশি অস্পষ্ট করেছে।

তিনি বলেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় আইনি বিচ্যুতি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—নির্বাচন কমিশন গণভোটকে ‘নির্বাচন’-এর সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করছে। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমার্থক নয়, কারণ এখানে কোনো ব্যক্তি বা আসনের পক্ষে ভোট প্রদান করা হয় না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশনা দিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নেওয়া জরুরি ছিল।

তার মতে, ইসি এ ক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোট পরিচালনায় অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।