আমরা কী এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে নাগরিকের সম্পদ, অর্থ ও নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি নেই?
- Update Time : ০৪:৫২:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫
- / ৩৬৮ Time View

বাংলাদেশে বর্তমানে এমন এক ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সম্পদের সুরক্ষা এবং ন্যায়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের প্রশ্ন আজ শুধু অর্থনীতির বিপর্যয় নিয়ে নয়, বরং সেই ন্যায়বিচারহীন ব্যবস্থার দিকেও, যা এই দুর্নীতিকে রক্ষা করে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে কখনো এত ব্যাপকভাবে জনগণের আমানতের অর্থ লুটপাট হয়নি, যতটা হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে।
ব্যাংক লুট: জনগণের অর্থ গেল কোথায়?
সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ৮০ শতাংশ অর্থ লোপাট হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণে প্রয়োজন ৩৮ বিলিয়ন ডলার—যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকার সমপরিমাণ! এই টাকা কোথায় গেল? কারা নিল? সাধারণ মানুষ যারা নিজেদের সঞ্চয় ব্যাংকে রেখেছিল, তাদের ভবিষ্যৎ আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। অথচ, আজ পর্যন্ত একজনও প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিতার আওতায় আসেনি।
কেন দোষীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে না?
প্রশ্ন জাগে—যারা এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের সম্পদ, জমি, বাড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কেন বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে না? কেন তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির মামলা হয়েও তারা বহাল তবিয়তে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে? আমাদের রাষ্ট্র কি শুধুই দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করার জন্য? একদিকে সাধারণ মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ, চাল-ডালের দামে নাকাল; অন্যদিকে ধনী চক্র রাষ্ট্রীয় টাকায় বিদেশে ব্যবসা করছে, সন্তানদের প্রাসাদে রেখে আরাম করছে।
সরকারের ভূমিকা: নীরবতা না সহযোগিতা?
বর্তমান সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও ব্যাংক খাতসহ প্রতিটি স্তরে একধরনের দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো—এই ৮০ শতাংশ অর্থ কি একদিনে লুট হয়ে গেছে? নিশ্চয়ই নয়। বছরের পর বছর ধরে সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও জবাবদিহিতাহীনতাই এই লুটপাটকে সম্ভব করেছে। অথচ কোনো শক্তিশালী তদন্ত হয়নি, বিচার হয়নি, সম্পদ ফেরত আনা হয়নি।
সাধারণ
বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ আজ বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত এবং ক্ষুব্ধ। যারা আয় করে, সঞ্চয় করে, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা রেখে দেয়—তাদের সেই অর্থ আজ নেই। তারা জানে না কাল ব্যাংকে গেলে টাকা পাবে কি না। প্রশ্ন হলো—এই রাষ্ট্র কি কেবল ধনী-ক্ষমতাবানদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য? সাধারণ নাগরিকের জন্য কি কোনো নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার বা মৌলিক অধিকার নেই?
সময় এসেছে জবাবদিহিতা ও জনতার আদালতের
এই পরিস্থিতিতে দরকার একটি স্বচ্ছ তদন্ত কমিশন, যা স্বাধীনভাবে ব্যাংক খাতের দুর্নীতির পূর্ণ তদন্ত করে জনগণের সামনে তুলে ধরবে। অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জনগণের টাকা ফেরত আনতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিতে হবে।
আমাদের করণীয়
১. সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে—সামাজিক মাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে।
২. আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে—মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজীবীদের মাধ্যমে ব্যাপক মামলা দায়ের করতে হবে।
৩. জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে—যাতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জনতার চাপ সৃষ্টি হয়।
৪. রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন—একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
শেষ কথা
আমরা এমন এক দেশে বাস করছি, যেখানে নিরাপদ নয় আমাদের অর্থ, ভবিষ্যৎ, কিংবা জীবনের নিশ্চয়তা। এই দেশ কি আমাদের? যদি আমাদের হয়, তাহলে কেন আমরা চুপ থাকি? আমাদের অর্থ কে নিল, কোথায় গেল, তা জানার এবং ফেরত চাওয়ার অধিকার আমাদের আছে। এখনই সময় সোচ্চার হওয়ার। কারণ যদি আজ না জাগি, কাল হয়তো আমাদের সন্তানেরা আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

















