আবারও ৯ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি
- Update Time : ০৫:৪২:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
- / ১৪০ Time View

দেশের অর্থনীতিতে আবারও উদ্বেগের সংকেত দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। চলতি অর্থবছরে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলেই মূল্যস্ফীতিকে আবারও ঊর্ধ্বমুখী করেছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পর পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্যসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু খাবার নয়, পোশাক, বাসাভাড়া, নির্মাণসামগ্রী, ইলেকট্রনিকস ও পরিবহন ব্যয়সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে।
গ্রাম ও শহরের মূল্যস্ফীতির মধ্যেও কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। এপ্রিলে গ্রামে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশে, আর শহরে ছিল ৯ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সময়ে শ্রমিকদের মজুরির হারও কিছুটা বেড়েছে। মার্চে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ায় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইনফ্লেশন ডায়নামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশে। শাকসবজি, মসলা ও প্রোটিনভিত্তিক খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাঁর মতে, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি, বিনিময় হার এবং জ্বালানি ব্যয়—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হবে। কারণ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)–এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তবে বহিঃবিশ্বের চাপ কিছুটা কমে আসলে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে ৮ শতাংশের ঘরে নেমে আসতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আয় বাড়ার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারকে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক ব্যয় কমাতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি মানুষের জীবনমান, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

















