সময়: রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেমিট্যান্সের নেপথ্যে রক্ত-ঘাম: দালালের ফাঁদ, মৃত্যু আর নির্যাতনের নির্মম গল্প

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৫:৪৭:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • / ২০৬ Time View

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। চলতি বছরের মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। কিন্তু এই রেকর্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের কান্না, বঞ্চনা ও নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতা। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করা এই শ্রমিকদের বড় একটি অংশ বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন, কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে, আবার কেউ নির্যাতিত অবস্থায় দেশে ফিরে আসছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের প্রাক্কালে প্রবাসী শ্রমিকদের এই করুণ বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য—“সুস্থ শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নবপ্রভাত”—শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের কথা বললেও বাস্তবে প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনও অবহেলিত।

রেমিট্যান্স বাড়ছে, নিরাপত্তা বাড়ছে না

বাংলাদেশ ১৯৭৬ সাল থেকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও এখনো অধিকাংশ শ্রমিক বিদেশে যান অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ কর্মী হিসেবে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, দুর্বল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বিদেশে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্য দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয়। অনেকেই জমি বিক্রি, ঋণ বা সুদে টাকা নিয়ে বিদেশে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ না পেয়ে বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। আবার প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকেও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার পরিবর্তে শ্রমিকদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দিনে ফিরছে ১৪ প্রবাসীর লাশ

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৭২ জন প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৪ জন প্রবাসীর লাশ দেশে ফিরেছে। এসব মৃত্যুর একটি বড় অংশই অস্বাভাবিক।

অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে মারা যাওয়া শ্রমিকদের ৩১ শতাংশের মৃত্যু অস্বাভাবিক। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ দুর্ঘটনায় এবং ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেছেন। বাকিদের কেউ হৃদরোগ, অসুস্থতা কিংবা কর্মপরিবেশজনিত জটিলতায় মারা গেছেন।

সম্প্রতি লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার সময় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ২০ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির সংকটে মাঝসমুদ্রে তাদের মৃত্যু হয়। একই সময়ে কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকেও একাধিক প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরে।

নারী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক নির্যাতন

বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের দুর্দশা আরও ভয়াবহ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের বড় অংশই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী শ্রমিক নির্যাতিত বা অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। অনেকেই বেতন না পেয়ে, পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে কিংবা দিনের পর দিন অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন।

সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ফিরে আসা বরিশালের এক নারী শ্রমিকের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে সৌদিতে যাওয়ার পর তাকে একাধিকবার হাতবদল করা হয় এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অথচ তিনি কোনো বেতনই পাননি।

দালালচক্রের প্রতারণায় নিঃস্ব শ্রমিকরা

বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে অসাধু দালালচক্র। অনেককে ভুয়া ভিসা দিয়ে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। কেউ বিমানবন্দর থেকেই ফেরত আসছেন, আবার কেউ বিদেশে গিয়ে মাসের পর মাস বেকার অবস্থায় থাকছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শ্রমিকদের শোষণ ও প্রতারণা কমছে না।

রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার দাবি

রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দালালচক্র দমন ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, “রেমিট্যান্স বাড়লেও প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হয়নি। শ্রমিকদের জন্য সরকারি সেবার মান অত্যন্ত দুর্বল। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী শ্রমিকদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে নয়, মানবসম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। তা না হলে রেমিট্যান্সের রেকর্ডের আড়ালে চাপা পড়ে থাকবে হাজারো পরিবারের কান্না ও স্বজন হারানোর বেদনা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

রেমিট্যান্সের নেপথ্যে রক্ত-ঘাম: দালালের ফাঁদ, মৃত্যু আর নির্যাতনের নির্মম গল্প

Update Time : ০৫:৪৭:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। চলতি বছরের মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। কিন্তু এই রেকর্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের কান্না, বঞ্চনা ও নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতা। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করা এই শ্রমিকদের বড় একটি অংশ বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন, কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে, আবার কেউ নির্যাতিত অবস্থায় দেশে ফিরে আসছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের প্রাক্কালে প্রবাসী শ্রমিকদের এই করুণ বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য—“সুস্থ শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নবপ্রভাত”—শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের কথা বললেও বাস্তবে প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনও অবহেলিত।

রেমিট্যান্স বাড়ছে, নিরাপত্তা বাড়ছে না

বাংলাদেশ ১৯৭৬ সাল থেকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও এখনো অধিকাংশ শ্রমিক বিদেশে যান অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ কর্মী হিসেবে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, দুর্বল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বিদেশে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্য দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয়। অনেকেই জমি বিক্রি, ঋণ বা সুদে টাকা নিয়ে বিদেশে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজ না পেয়ে বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। আবার প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকেও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার পরিবর্তে শ্রমিকদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দিনে ফিরছে ১৪ প্রবাসীর লাশ

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৭২ জন প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৪ জন প্রবাসীর লাশ দেশে ফিরেছে। এসব মৃত্যুর একটি বড় অংশই অস্বাভাবিক।

অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে মারা যাওয়া শ্রমিকদের ৩১ শতাংশের মৃত্যু অস্বাভাবিক। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ দুর্ঘটনায় এবং ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেছেন। বাকিদের কেউ হৃদরোগ, অসুস্থতা কিংবা কর্মপরিবেশজনিত জটিলতায় মারা গেছেন।

সম্প্রতি লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার সময় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ২০ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির সংকটে মাঝসমুদ্রে তাদের মৃত্যু হয়। একই সময়ে কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকেও একাধিক প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরে।

নারী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক নির্যাতন

বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের দুর্দশা আরও ভয়াবহ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের বড় অংশই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী শ্রমিক নির্যাতিত বা অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। অনেকেই বেতন না পেয়ে, পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে কিংবা দিনের পর দিন অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন।

সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ফিরে আসা বরিশালের এক নারী শ্রমিকের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে সৌদিতে যাওয়ার পর তাকে একাধিকবার হাতবদল করা হয় এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অথচ তিনি কোনো বেতনই পাননি।

দালালচক্রের প্রতারণায় নিঃস্ব শ্রমিকরা

বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে অসাধু দালালচক্র। অনেককে ভুয়া ভিসা দিয়ে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। কেউ বিমানবন্দর থেকেই ফেরত আসছেন, আবার কেউ বিদেশে গিয়ে মাসের পর মাস বেকার অবস্থায় থাকছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শ্রমিকদের শোষণ ও প্রতারণা কমছে না।

রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার দাবি

রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দালালচক্র দমন ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, “রেমিট্যান্স বাড়লেও প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হয়নি। শ্রমিকদের জন্য সরকারি সেবার মান অত্যন্ত দুর্বল। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী শ্রমিকদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে নয়, মানবসম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। তা না হলে রেমিট্যান্সের রেকর্ডের আড়ালে চাপা পড়ে থাকবে হাজারো পরিবারের কান্না ও স্বজন হারানোর বেদনা।