সময়: শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরীয়াহ নীতি অনুসরণ না করায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর কোটি কোটি টাকা লুট: বিআইবিএমের গবেষণা প্রতিবেদন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:৩৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৭০ Time View

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শরীয়াহ নীতি অবহেলা, ডকুমেন্টেশন ত্রুটি এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ক্রমেই একটি গুরুতর সংকটের রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) জানিয়েছে—এসব কারণেই দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে, আর ব্যাংকগুলোর পরিচালনাগত ঝুঁকি ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।

বুধবার প্রকাশিত বিআইবিএমের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শরীয়াহ আইন সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি, বরং ভুল চুক্তি, শিথিল ডকুমেন্টেশন এবং ম্যানুয়াল প্রসেসিং-এর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন চক্র ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ কৌশলে বের করে নিয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, অনিয়ম, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ভুল চুক্তি দুর্বল ডকুমেন্টেশন: ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু

গবেষকরা বলেন, শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রধান শক্তি হলো চুক্তির কঠোরতা ও স্বচ্ছতা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ব্যাংকে চুক্তিগুলো ছিল ভুলভাবে প্রস্তুত করা, অস্পষ্ট, এবং শরীয়াহ নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। জটিল ও দুর্বল ডকুমেন্টেশনের কারণে ঋণ বা বিনিয়োগের নামে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার সঠিক ট্রেস পাওয়া যায়নি।

বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মহব্বত হোসেন বলেন,
“যে ফাইন্যান্সগুলো অনুমোদন করা হয়েছে, সেখানে কোনো ব্যাংকিং নর্মসই মানা হয়নি—হোক তা শরীয়াহ ভিত্তিক বা প্রচলিত ব্যাংকিং। ২০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি—যা দেওয়ার কথা, তা আগেই দেওয়া হয়েছে; শুধু কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে—এই দেখানো ছাড়া কিছুই হয়নি।”

অযোগ্য দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অপব্যবহার

গবেষণায় আরও বলা হয়, অনেক ইসলামী ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে যাদের নেই পর্যাপ্ত দক্ষতা, সততা বা শরীয়াহ জ্ঞান। এই অদক্ষতার সুযোগ নিয়েই কিছু পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং বাহ্যিক শক্তি ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ লুট করেছে।

বিআইবিএম মহাপরিচালক মাহবুবুল হক বলেন,
“জাকাতের মতো ইসলামী আর্থিক খাতের অন্যতম পবিত্র অর্থ পর্যন্ত শত শত কোটি টাকা কিছু পরিচালক নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। এর চেয়ে বড় অনিয়মের উদাহরণ আর লাগে না।”

প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও বড় অপরাধের সুযোগ তৈরি করেছে

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনো ব্যাপকভাবে ম্যানুয়াল প্রসেসিং-এর ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল নজরদারি বা আধুনিক প্রযুক্তিগত সুরক্ষা না থাকায় জালিয়াতি, ভুয়া কাগজপত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বড় ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের দাবি

আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এখনো কোনো স্বতন্ত্র ও আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং আইন নেই। ফলে এ খাতের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, মনিটরিং ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গবেষকরা মনে করেন, শরীয়াহ নীতি নিশ্চিত করতে এবং অপব্যবহার বন্ধ করতে পৃথক ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন জরুরি।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শরীয়াহ নীতি অনুসরণ না করায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর কোটি কোটি টাকা লুট: বিআইবিএমের গবেষণা প্রতিবেদন

Update Time : ০৭:৩৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শরীয়াহ নীতি অবহেলা, ডকুমেন্টেশন ত্রুটি এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ক্রমেই একটি গুরুতর সংকটের রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) জানিয়েছে—এসব কারণেই দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে, আর ব্যাংকগুলোর পরিচালনাগত ঝুঁকি ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।

বুধবার প্রকাশিত বিআইবিএমের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শরীয়াহ আইন সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি, বরং ভুল চুক্তি, শিথিল ডকুমেন্টেশন এবং ম্যানুয়াল প্রসেসিং-এর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন চক্র ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ কৌশলে বের করে নিয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, অনিয়ম, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ভুল চুক্তি দুর্বল ডকুমেন্টেশন: ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু

গবেষকরা বলেন, শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রধান শক্তি হলো চুক্তির কঠোরতা ও স্বচ্ছতা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ব্যাংকে চুক্তিগুলো ছিল ভুলভাবে প্রস্তুত করা, অস্পষ্ট, এবং শরীয়াহ নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। জটিল ও দুর্বল ডকুমেন্টেশনের কারণে ঋণ বা বিনিয়োগের নামে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার সঠিক ট্রেস পাওয়া যায়নি।

বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মহব্বত হোসেন বলেন,
“যে ফাইন্যান্সগুলো অনুমোদন করা হয়েছে, সেখানে কোনো ব্যাংকিং নর্মসই মানা হয়নি—হোক তা শরীয়াহ ভিত্তিক বা প্রচলিত ব্যাংকিং। ২০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি—যা দেওয়ার কথা, তা আগেই দেওয়া হয়েছে; শুধু কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে—এই দেখানো ছাড়া কিছুই হয়নি।”

অযোগ্য দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অপব্যবহার

গবেষণায় আরও বলা হয়, অনেক ইসলামী ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে যাদের নেই পর্যাপ্ত দক্ষতা, সততা বা শরীয়াহ জ্ঞান। এই অদক্ষতার সুযোগ নিয়েই কিছু পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং বাহ্যিক শক্তি ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ লুট করেছে।

বিআইবিএম মহাপরিচালক মাহবুবুল হক বলেন,
“জাকাতের মতো ইসলামী আর্থিক খাতের অন্যতম পবিত্র অর্থ পর্যন্ত শত শত কোটি টাকা কিছু পরিচালক নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। এর চেয়ে বড় অনিয়মের উদাহরণ আর লাগে না।”

প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও বড় অপরাধের সুযোগ তৈরি করেছে

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইসলামী ব্যাংকগুলো এখনো ব্যাপকভাবে ম্যানুয়াল প্রসেসিং-এর ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল নজরদারি বা আধুনিক প্রযুক্তিগত সুরক্ষা না থাকায় জালিয়াতি, ভুয়া কাগজপত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বড় ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের দাবি

আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এখনো কোনো স্বতন্ত্র ও আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং আইন নেই। ফলে এ খাতের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, মনিটরিং ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গবেষকরা মনে করেন, শরীয়াহ নীতি নিশ্চিত করতে এবং অপব্যবহার বন্ধ করতে পৃথক ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন জরুরি।