মোবাইলে অশোভন বার্তা পাঠালে ২ বছরের দণ্ড ও দেড় কোটি টাকা জরিমানা,টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের খসড়া
- Update Time : ১০:০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ২১৩ Time View

মোবাইল ফোনে অশ্লীল, অশোভন বা অপমানজনক কোনো বার্তা পাঠালে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের মুখে পড়তে হতে পারে। একইভাবে, অযৌক্তিকভাবে কাউকে বারবার ফোন করে বিরক্ত বা হয়রানি করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এসব কঠোর শাস্তির প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ায়।
বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া। এই খসড়ায় মোবাইল বা ইন্টারনেটভিত্তিক যেকোনো মাধ্যমে অশোভন, অশ্লীল বা অপমানজনক বার্তা পাঠানো, কাউকে বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে বারবার ফোন করা কিংবা অনুমতি ছাড়া টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ডকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অশোভন বার্তার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান
অধ্যাদেশের ধারা ৬৯ অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ বা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে অশ্লীল, ভীতিকর, অপমানজনক বা অশোভন কোনো বার্তা, ছবি বা ভিডিও প্রেরণ করলে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দেড় কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। যদি অপরাধটি ‘গুরুতর’ হিসেবে গণ্য হয়, তবে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া, ধারা ৭০-এ বলা হয়েছে, যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কাউকে বারবার ফোন করে বিরক্ত বা হয়রানি করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
বেআইনি আড়িপাতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
খসড়া অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি অনুমতি ছাড়া অন্যের কথোপকথনে আড়ি পাতেন বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে দুই বছরের কারাদণ্ড বা দেড় কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওটিটি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে
খসড়া অধ্যাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা নিয়ন্ত্রণ। এতে বলা হয়েছে, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মেসেজিং ও ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ—সবই সরকারের অনুমোদনের আওতায় আসবে। এসব প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশে নিবন্ধন নিতে হবে এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তা সংস্থাকে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। অর্থাৎ, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স বা অন্যান্য বিদেশি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকেও বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।
গঠিত হবে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কমিশন’
অধ্যাদেশে প্রস্তাব করা হয়েছে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার নাম হবে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কমিশন’ (BTC)। কমিশনটি টেলিযোগাযোগ খাতের লাইসেন্স প্রদান, নীতিনির্ধারণ, স্পেকট্রাম বণ্টন, প্রযুক্তিগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। পাঁচ সদস্যের এই কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান থাকবেন। এর মূল উদ্দেশ্য হবে টেলিযোগাযোগ খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, একইসঙ্গে ব্যবহারকারীদের অধিকার রক্ষা করা।
অনুমতিহীন টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ
খসড়া অনুযায়ী, সরকারের অনুমতি ছাড়া টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করা বা বিদেশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে সরকার যেকোনো প্ল্যাটফর্ম সাময়িকভাবে স্থগিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ করার ক্ষমতা রাখবে।
জনমত গ্রহণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ইতোমধ্যে অধ্যাদেশের খসড়াটি বিভাগের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করেছে, যাতে অংশীজন, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ নাগরিকরা মতামত দিতে পারেন। মতামত পাঠানোর শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। মতামত পাঠানো যাবে ই-মেইলে: [email protected], অথবা ডাকযোগে পাঠানো যাবে—সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা ঠিকানায়।
আধুনিক ডিজিটাল সমাজে নৈতিক ও নিরাপদ যোগাযোগের লক্ষ্য
সরকারের দাবি, এই নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে একটি নৈতিক, নিরাপদ ও দায়বদ্ধ ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা, অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধ এবং টেলিযোগাযোগ খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনটি যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত না করে, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল খাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এ ধরনের একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো অত্যন্ত জরুরি।
চূড়ান্তভাবে অধ্যাদেশটি অনুমোদন পেলে, এটি ২০০১ সালের পুরনো টেলিযোগাযোগ আইনকে প্রতিস্থাপন করে দেশে ডিজিটাল যুগের উপযোগী একটি নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলবে।










